বিশেষ প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে অবস্থিত জিপিএইচ ইস্পাত কারখানায় একের পর এক শ্রমিকের মৃত্যুও ঘটনা ঘটছে। গত এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ৪টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১১ জন শ্রমিক। আহত হয়েছেন ৯ জন শ্রমিক।

সর্বশেষ শুক্রবার সকালে এই কারখানায় আরেক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন একজন শ্রমিক। আহত হয়েছেন অপর এক শ্রমিক। হতাহতদের কেউ তপ্ত গলিত লোহায় দ্বগ্ধ হয়ে, কেউ প্রেøট চাপা পড়ে, কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্টেসহ নানা দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করছে। এতে অনেক শ্রমিক গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছে চিরদিনের জন্য। এভাবে একের পর এক দুর্ঘটনায় এই কারখানা এখন শ্রমিকদের জন্য মৃত্যুকূপ হয়ে উঠেছে।

শ্রমিকদের অভিযোগ, ব্যয় কমাতে প্রতিষ্ঠানটি যেমন পুরনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছে, তেমনি উৎপাদনের জন্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করেনি। লোহা গলানোর কাজে সরাসরি শ্রমিকদের অংশ নিতে হচ্ছে। ব্যয় কমাতে গিয়ে শ্রমিকদের এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পেটের দায়ে অসহায় শ্রমিকরা ঝুঁকি নিয়ে এই কারখানায় কাজের নামে মৃত্যুকে বরণ করে নিচ্ছে।

শ্রমিকরা জানান, কিছুদিন পরপরই জিপিএইচ কারখানার শ্রমিকদের দগ্ধ ও নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। শুক্রবার সকালে মোস্তফা (৩৫) নামে এক শ্রমিক মারা যায়। সে কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর থানার বারশিকুরার এলাকার মো. জসিমের ছেলে। এ ঘটনায় আহত মো. রাশেদ (২৫) সীতাকুন্ড উপজেলার দক্ষিণ হিঙ্গুলিপাড়ার মো. তাজুল ইসলামের ছেলে।

জানা যায়, কারখানায় মেইনটেইনের কাজ করার সময় প্যাডেলের ধাক্কা লেগে দুই শ্রমিক গুরুতর আহত হন। তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক মো. মোস্তফাকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত মো. রাশেদ চিকিৎসাধীন অবস্থায় (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তার অবস্থাও আশংকাজনক।

এর আগে গত ১৯ অক্টোবর জিপিএইচ ই¯পাত কারখানায় ছয় শ্রমিক গলিত লোহায় দগ্ধ হন। ২২ সেপ্টেম্বর জিপিএইচ ই¯পাতের কারখানায় লোহার উত্তপ্ত লাভায় দগ্ধ হন সাতজন। ৫ আগস্ট বিকেলে জিপিএইচ ইস্পাত কারখানায় বিদ্যুৎ¯পষ্টে দুই শ্রমিক নিহত হয়। ১০ এপ্রিল ভোরে লৌহজাত পণ্য লোডিংয়ের সময় লোহার পাতের চাপায় নিহত হন জিপিএইচের কারখানার শ্রমিক রণজিৎ বর্মন।

২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর জিপিএইচ কারখানায় লোহা গলানোর চুল্লিতে বিস্ফোরণ ঘটলে ১১ জন দগ্ধ হন; তাদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের ৮০ শতাংশের বেশি পুড়ে যায়। এর বাইরে বিভিন্ন সময় প্রতিষ্ঠানটিতে দগ্ধ হয়ে আরও বেশকিছু শ্রমিকের দগ্ধ ও নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে জিপিএইচ কারখানা কর্তৃপক্ষের অবহেলায় একের পর এক শ্রমিক নিহত হলেও রহস্যজনক কারণে প্রশাসন চুপ। অপমৃত্যু মামলা দায়ের করে দায় সারছে সীতাকুন্ড থানা পুলিশ। অন্যদিকে শিল্প প্রতিষ্ঠানের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি-সামর্থ্য কোনটাই না থাকায় সামান্য টাকায় আপোস করে ফেলছে ভুক্তভোগীদের পরিবার।

সীতাকুন্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুমন বণিক এ প্রসঙ্গে বলেন, জিপিএইচ ইস্পাত কারখানায় নিহত ও আহতদের পক্ষ থেকে অভিযোগ না পাওয়ায় অধিকাংশই অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। শুক্রবারের দুর্ঘঘটনায় নিহতেরও অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। অবহেলায় মৃত্যু বা অন্য কোন অভিযোগ যদি কেউ করত আমরা সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারতাম।

অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলমাস শিমুলের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

শুচ/ইখ