স্টাফ রিপোর্টার :
চট্টগ্রাম মহানগরীর চকবাজার মোড়ে অবস্থিত সিটি হেলথ ক্লিনিক। যেখানে কোন চিকিৎসক বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স ছিল না। তবুও বছরের পর বছর চলে আসছিল চিকিৎসা। এরমধ্যে অবাধে চলতো অবৈধ গর্ভপাত। ফলে ক্লিনিকের মালিকসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

এমন তথ্য জানিয়েছেন নগর পুলিশের দক্ষিণ জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, ক্লিনিকটির সরকারি নিবন্ধন বা বৈধ কোন কাগজপত্র নেই। ফলে অবৈধ ক্লিনিকটি ইতোমধ্যে বন্ধ করে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

শুক্রবার সকালে যোগাযোগ করা হলে ক্লিনিকটি বন্ধ করে দেয়ার কথা জানান চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বিও। তিনি জানান, সিটি হেলথ ক্লিনিকের কোন নিবন্ধন বা বৈধ কাগজপত্র পাইনি। কয়েকজন ডিপ্লোমা নার্সের কাগজপত্র পাওয়া গেছে। বাস্তবতা হচ্ছে সেখানে কোন নার্স নেই। ক্লিনিকের মালিক হারুনুর রশিদও এইচএসসি পাশ। তিনি নিজেই সার্জিক্যাল কাজটি করতেন। প্রায় ৩৪ বছর ধরে ক্লিনিকটি এভাবে চলছিল। পুলিশ ক্লিনিকটির মালিকসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

এদের মধ্যে দুজনের জবানবন্দিতে বছরের পর বছর অগণিত অবৈধ গর্ভপাতের তথ্যও উঠে আসে। গর্ভপাতে অনেকের মৃত্যুর তথ্যও উঠে এসেছে। সম্প্রতি অবৈধ গর্ভপাত ঘটাতে গিয়ে টানা দুইদিন রক্তপাতের কারণে রিফাত সুলতানা নামে এক কলেজ ছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ এই রহস্য পায় বলে জানান ডিসি মেহেদী হাসান।

তিনি বলেন, ১৯৮৬ সাল থেকে এই ক্লিনিকে অবৈধ কর্মকান্ড চললেও রহস্যজনক কারণে কখনো কারো নজরে পড়েনি। গত ১৫ মে অবৈধ গর্ভপাত ঘটাতে গিয়ে চান্দগাঁও হাজেরা তজু ডিগ্রি কলেজের বিবিএস শেষ বর্ষের ছাত্রী রিফাত সুলতানার মৃত্যু হয়। রিফাত লেখাপাড়ার পাশাপাশি আগ্রাবাদ গ্লোবাল ডাটা এন্ট্রি নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতো। চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার তিন নম্বর সড়কের লায়লা হাউজের নীচতলায় বোনের সাথে থাকত। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওই তরুণী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বলে পরিবারকে লাশ বুঝিয়ে দেয়।

এর ১০ দিন পর ২৬ মে ওই তরুণীর বাবা চকবাজার থানায় এসে তার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে বলে সেজান নামে এক তরুণীর বন্ধু ও অন্য এক যুবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। মামলার পর সেজানকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে জানায় রিফাতের গর্ভপাত করানোর জন্য সিটি হেলথ ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়েছিল। সেখানেই সে মারা যায়।

আটক সেজান ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আদালতেও ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। মামলার পর ওই তরুণীর লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়না-তদন্ত ও পরীক্ষার জন্য ডিএনএ নমুনা নেয়া হয়। ২৫ অক্টোবর ডিএনএ প্রতিবেদন আসলে পুলিশ নিশ্চিত হয় তরুণীর সাথে কেউ শারীরিক মেলামেশা করেছে। এরপর গত বুধবার অলকা পাল (৩২) নামে হাসপাতালের এক নার্সকে আটক করা হয়। অলকা মেট্টোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার জাহানের আদালতে রিফাত সুলতানার মৃত্যুর বর্ণনা দিয়ে জবানবন্দি দিয়েছে।

অলকা পাল বলেন, তার বাড়ি কুতুবদিয়া। সাত বছর ধরে সিটি হেলথ ক্লিনিকে চাকরি করছেন। তবে নার্স হিসাবে তার কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। সিটি হেলথ ক্লিনিকে কাজ করতে করতে নার্সিংয়ে পারদর্শী হয়। তিনি অনেকের গর্ভপাত ঘটিয়েছেন। চ¤পা বেগম নামে এক নার্সও চুক্তিভিত্তিক গর্ভপাতের কাজ করেন এ ক্লিনিকে।

অলকা বলেন, গত ১৪ মে সকালে একটি ছেলে ও রিফাত নামে মেয়েটি ক্লিনিকে আসে। ক্লিনিকের মালিক হারুন নার্স চ¤পা বেগমকে ফোন করে নিয়ে আসে। এরপর রিফাতকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যায়। সেখানে তার যৌনাঙ্গে একটি ট্যাবলেট দেয় চ¤পা। কিছুক্ষণ পর রিফাতকে ক্লিনিকের চার নম্বর বেডে রেখে চ¤পা চলে যায়।

ওইদিন রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টায় রিফাতের প্রচন্ড ব্যথা উঠে। বিষয়টি জানার পর হারুন ফের নার্স চ¤পাকে ডেকে নিয়ে আসে। তাকে একটি স্যালাইন লাগানো হয়। অবস্থার অবনতি হলে রাত একটার দিকে রিফাতকে আবারো অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর তাকে বেডে রেখে চ¤পা ও হারুন বাসায় চলে যায়।

অলকা বলেন, পরের দিন ১৫ মে দুপুরে রিফাতের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়। নার্স চ¤পা এসে আবারো দেখে যায়। বিকেল পাঁচটার দিকে রিফাত মারা গেলে তার মা বাবাকে খবর দেয়া হয়। করোনায় রিফাতের মৃত্যু হয়েছে বলে মা-বাবাকে জানানো হয়। তারা এম্বুলেন্সে করে রিফাতের মৃতদেহ নিয়ে যায়।

স্থানীয় লোকজন জানান, ১৯৮৬ সাল থেকে সিটি হেলথ ক্লিনিকটি পরিচালনা করেন চট্টগ্রাম মহানগরীর বহদ্দারহাট খাজা রোডের বাসিন্দা মোহাম্মদ হারুন। সে ডাক্তার নয়। বুধবার রাতে সিভিল সার্জন ক্লিনিকটি বন্ধ করে দিলে হারুনের কুকীর্তি ফাঁস হয়।

শুচ/ইখ