স্টাফ রিপোর্টার, বাঁশখালী থেকে :
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্রসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলো ৩৪ জলদস্যু। যারা সুন্দরবন, টেকনাফ, কুতুবদিয়া ও মহেশখালীসহ বঙ্গোপসাগরের বিভিন্নস্থানে মাছ ধরার ট্রলার ও পণ্যবাহি জাহাজে ডাকাতি করতো।

কিন্তু র‌্যাব-৭ এর তত্ত্বাবধানে বৃহ¯পতিবার (১২ নভেম্বর) দুপুরে বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের কাছে অস্ত্রসমর্পণ কওে তারা। এ সময় অতীত কর্মকান্ডের জন্য ক্ষমা চেয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন জলদস্যুরা। এ সময় ৯০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২ হাজার ৫৬টি গুলি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন তারা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ সময় জলদস্যুদের উদ্দেশ্যে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দেশের উপকূলীয় এলাকায় কোনো জলদস্যু, বনদস্যু কাউকে আস্তানা গড়তে দেওয়া হবে না । দস্যুরা কোথাও পালিয়ে থাকতে পারবে না।

মন্ত্রী বলেন, অস্ত্রসমর্পণ যারা করেননি তারা ভাববেন না, আপনাদের কিছু হবে না। আপনারা যা যা করছেন সবই আমরা দেখছি, কোথাও পালিয়ে থাকতে পারবেন না। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এখন আগের চেয়ে অনেক দক্ষতা ও সক্ষমতায় পরিপূর্ণ।

তিনি বলেন, একসময় উপকূলের লোকজন এসব জলদস্যুদের কাছে জিম্মি ছিলো। ধার করে হলেও দস্যূদের দাবিকৃত টাকা পরিশোধ করতে হতো। জেলেদের নিয়ে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। সেদিন এখন আর নেই।

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, শেখ হাসিনার বাংলদেশে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের দেশে কোন চোর ডাকাত থাকতে পারে না। যারা আত্নসমর্পণ করেছে, তারা যেন সমাজের মূলধারায় ফিরে আসতে পারে সেজন্য সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।

র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মশিউর রহমান বলেন, ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর ৪৩ জন জলদস্যু আত্নসমর্পণ করেছে। জলদস্যুদের অস্ত্র সমর্পণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছে র‌্যাব। এর মধ্যে সুন্দরবন এলাকায় সক্রিয় জলদস্যুদের বড় একটি অংশকে ইতিমধ্যে অস্ত্র সমর্পণ করানো সম্ভব হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, হত্যা ও ধর্ষণ মামলা ছাড়া এসব জলদস্যুদের বিরুদ্ধে চলমান বিভিন্ন মামলা আইনি প্রক্রিয়ায় প্রত্যাহার করা হবে। যারা এখনো আত্নসমর্পণ করেননি তাদের আইনের আওতায় আনতে র‌্যাবের ধারাবাহিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।

আত্নসমর্পণ করা জলদস্যুদের সকলেই চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা বলে জানায় র‌্যাব। জলদস্যুরা হলেন, বাইশ্যা বাহিনীর আব্দুল হাকিম ওরফে বাইশ্যা ডাকাত (৫২), আহামদ উল্লাহ (৪২) ও আব্দুল গফুর ওরফে গফুর (৪৭)। ফুতুক বাহিনীর দিদারুল ইসলাম ওরফে পুতিক্যা (৩২), জসিম উদ্দিন (২৬) ও মিজানুর রহমান (২৩)। খলিল বাহিনীর আব্দুর রহিম (৬৪) ও মাহমুদ আলী প্রকাশ ভেট্টা।

বাদল বাহিনীর ওবায়দুল্লাহ (৩৬), রমিজ বাহিনীর ইউনুছ (৫৬), দিদার বাহিনীর তৌহিদ ইসলাম (৩৪), বাদশা বাহিনীর নিজাম উদ্দিন ভান্ডারী, ইউনুস (৫১), কামাল উদ্দিন (৪৭), কাদের বাহিনীর আব্দু শুক্কুর (২৮)।

জিয়া বাহিনীর সাহাদাত হোসেন দোয়েল (৪১), পারভেজ (৩৩), নাছির বাহিনীর নাছির (৫১), আমির হোসেন (৪৮), সাকের (৪০)। কালাবদা বাহিনীর সেলিম বাদশা (৩৪), আব্দুল গফুর ওরফে গফুর, আবু বক্কর সিদ্দিক (৩১), মামুন মিয়া (২৭)।

অন্যান্য দস্যুবাহিনীর আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে বাইশ্যা (২৯), বেলাল মিয়া (৩০), আব্দুল হাকিম ওরফে বাককু (৩৫), রশিদ মিয়া (৩৬), ইসমাইল (২৪), শাবউদ্দিন ওরফে টুনু (৩২), ফেরদৌস (৫২), রেজাউল করিম (৪০), ইউনুচ (৪২) ও ম›জুর আলম (৪২)।

প্রসঙ্গত. গত কয়েকবছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রমাগত অভিযানের ফলে কোনঠাসা হয়ে পড়ে জলদস্যুরা। টিকতে না পেরে তারা বেছে নিতে শুরু করে আত্নসমর্পণের পথ। ২০০৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত র‌্যাব চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২৪৮ জন জলদস্যুকে আটক করে। তাদের থেকে ৭৯৭টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৮৮৪২ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়।

২০১৬ সালের ৩১ মে সুন্দরবনের কুখ্যাত মাস্টার বাহিনী আত্নসমর্পণের মাধ্যমে দস্যুদের আত্নসমর্পণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন উপকূলের ৩২৮ জন জলদস্যু আত্নসমর্পণ করেছে।

আত্নসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী, মো. মোসলেম উদ্দিন, আশেক উল্লাহ রফিক ও মোহাম্মদ জাফর আলমসহ পুলিশ প্রধান বেনজির আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন র‌্যাব-৭ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মশিউর রহমান।

শুছ/ইখ