স্টাফ রিপোর্টার :
হাতুড়ে নার্স দিয়ে গর্ভপাত ঘটাতে গিয়ে মৃত্যু হয় কলেজ ছাত্রী রিফাত সুলতানার (২৫)। কিন্তু ছড়িয়ে দেওয়া হয় করোনার গুজব। যে কারণে মেয়ে নিহতের শোক ভোলার আগেই লাশ দাফনে চরম বৈরিতার মুখোমুখি হতে হয় নিহত রিফাতের পরিবারকে।

বৃহস্পতিবার (১২ নভেম্বর) দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) দক্ষিণের ডিসি মেহেদী হাসান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, অবৈধ গর্ভপাত ঘটানো চকবাজার সিটি হেলথ ক্লিনিকের বৈধ কোনো কাগজপত্র নেই। হাসপাতালের কথিত পরিচালক হারুনর রশিদ কয়েকজন হাতুরে আয়া ও নার্স দিয়ে হাসপাতালটি পরিচালনা করছিলেন।

ফলে বুধবার (১১ নভেম্বর) রাতে সিটি হেলথ ক্লিনিকের পরিচালক মো. হারুনর রশিদ (৬০), কথিত নার্স অলকা পাল (৩২), আয়া গীতা দাস (৪৫) ও নার্স সাবিনা ইয়াসমিন চ¤পাকে (৪৩) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজন ইতোমধ্যেই সিটি হেলথ ক্লিনিকে অবৈধভাবে গর্ভপাত করানোর সময় কলেজ ছাত্রী রিফাত সুলতানার মৃত্যু হয়েছে বলে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। এরপর আদালতের নির্দেশে ক্লিনিকটি বন্ধ করে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

ডিসি মেহেদী হাসান বলেন, আমাদের কাছে তথ্য ছিলো গর্ভপাত ঘটাতে গিয়ে ওই কলেজ ছাত্রীর মৃত্যু হয়। গত চারমাস ধরে আমরা মূল রহস্যটি উৎঘাটন করেছি। ঘটনাটি এমন, গত মে মাসের ১৪ তারিখে এই মেয়েটিকে ওই হাসপাতালে নিয়ে আসে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য। এই ধরনের চিকিৎসা সেবা যে ধরনের চিকিৎসক দিয়ে করানো প্রয়োজন। আমরা তদন্তে পেয়েছি সেই ধরনের কোনো চিকিৎসক বা নার্স এই চিকিৎসা দেয়নি। এই চিকিৎসা করেছে দুইজন নার্স যাদের কোনো প্রশিক্ষণ নাই, যারা দেখে দেখে এসব শিখেছে ওই হাসপাতালে, এবং একজন আয়া। এই অপ চিকিৎসার কালেই মেয়েটির মৃত্যু ঘটে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে আশ্চার্য্যজনক কথা হলো, এই হাসপাতালের পরিচালক নিহতের অভিভাবকদের ডেকে নিয়ে বলে আপনার মেয়ের করোনা হয়েছিলো এবং করোনার কারণে তিনি মারা গেছেন। অভিভাবক প্রথমে বিভ্রান্ত ছিলেন, পরবর্তিতে তারা জানতে পারেন এই ধরনের চিকিৎসা করতে গিয়ে তাদের মেয়ে মারা গেছে তখন তারা হত্যা মামলা দায়ের করেন।

আসামিদের স্বীকারোক্তির বরাতে তিনি বলেন, এই অপচিকিৎসা করানোর সময় কথিত নার্সরা যখন বার বার ডাক্তার ডাকার অনুরোধ করলেও তিনি সেটিও করেননি। বিষয়টি অবহেলার নয়, তাই সবমিলিয়ে এটিকে আমাদের কাছে হত্যাকান্ড বলে বিবেচিত হয়েছে।

পুলিশের এ কর্মকর্তা জানান, এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় নিহতে কথিত বন্ধু জিসানসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া এ ঘটনায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন ঘটনার পর মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের চালক ও কথিত নার্স অলকা পাল।

নিহতের বাবা খোকন মিয়াজি জানান, নিহত রিফাত সুলতানা ও তার ছোট বোন রিয়াদ সুলতানা নগরের চাঁন্দগাও আবাসিকে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতো। ওই সময় করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে দুজনেই রাঙ্গুনিয়ায় গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিলো। ১৩ মে রিফাত সুলতানা নিজের ক¤িপউটার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য শহরে আসে। ১৫ তারিখ তিনি রিফাতের মৃত্যু সংবাদ পান।

খোকন মিয়াজি বলেন, আমি সেদিন দোহাজারি ছিলাম। হঠাৎ করে একজন ফোন দিয়ে বললো আপনার মেয়ে মারা গেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম তুমি কে। বললো আমি জিসান। আমার বিশ্বাস হচ্ছিলো না, সুস্থ একটা মেয়ে বাড়ি থেকে গেছে ক¤িপউটারের জন্য। হঠাৎ করে সে কিভাবে মারা গেছে?

তিনি বলেন, আমি মেয়ের মাকে নিয়ে হাসপাতালে এসে জিজ্ঞেস করলাম কিভাবে মারা গেছে। তারা বললো করোনা.. করোনা ..। আমার মেয়েটাকে আমাকে ধরতেও দেয় নাই। রমজান মাসে এমন একটা ঘটনা ঘটলো, আমাকে আমার মেয়েকে দাফন করতেও অনেক কষ্ট হয়েছে। তাকে ধোয়ানের জন্যও কাউকে পাওয়া যাচ্ছিলো না। শেষে ধোয়াতে গিয়ে আমরা দেখলাম মেয়ের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ¯পট আছে। বুঝতে পারলাম আমার মেয়ে করোনায় মরে নাই।

নিহতের বোন রিয়াদ সুলতানা বলেন, ১৪ তারিখ আপু আমাকে ফোন দিয়ে বলে কি আমি অসুস্থ’। পরেরদিন আমাকে বলে আমি সকালে আসবো কিন্তু এরপর থেকে আমি ফোন দেই কিন্তু রিসিভ হয়না। বিকেলে আমাকে একজনে ফোন দিয়ে বলে লাশ নিয়ে যাও। ওরা আমার আপুর নাম্বার থেকেও ফোন দিয়েছে। সিজানের নাম্বার থেকেও ফোন দিয়েছে। বলে তোমার বোন করোনায় মারা গেছে।

শুচ/ইখ