খ. ম ইব্রাহিম :
রেলে ব্যবহৃত সব রকম খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরীর সক্ষমতা রয়েছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে অবস্থিত ওয়ার্কসপে। কিন্তু বাস্তবে এই ওয়ার্কসপে কোন যন্ত্রাংশই তৈরী হচ্ছে না গত ৮-১০ বছর ধরে। কিন্তু এই ওয়ার্কসপে তৈরীর নামে কোটি কোটি টাকার খুচরা যন্ত্রাংশ আসছে। যার পুরোটাই নকল। যাকে বিশেষ আদর করে বলা হচ্ছে মেইড ইন মোগলটুলি বা মাদারবাড়ি।

অভিযোগ উঠেছে, সংঘবদ্ধ ঠিকাদার চক্রের যোগসাজশে সুকৌশলে নকল এসব যন্ত্রাংশ আনা এবং তা রেলের ওয়ার্কসপে তৈরী বলে চালিয়ে দিচ্ছে ওয়ার্কসপের কর্ম ব্যবস্থাপক রাশেদ লতিফ। অবশ্যই তিনি এই পদে যোগ দিয়েছে ৫-৬ মাস আগে। এর আগে এ পদে আসীন ছিলেন সাইফুল ইসলাম। যিনি সংঘবদ্ধ একই ঠিকাদার চক্রের পাল্লায় পড়ে নকল যন্ত্রাংশ তৈরীর কারচুপি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর অন্যত্র বদলি হয়ে যান।

কিন্তু তাতে কোন সমাধান আসেনি। বরং সাইফুল ইসলামের পদাঙ্ক অনুসরণ করে মেইড ইন মোগলটুলি ও মাদারবাড়ির বিভিন্ন কারখানায় অদক্ষ শ্রমিক দিয়ে নকল যন্ত্রাংশ তৈরী করে ওয়ার্কসপে তৈরীর নামে রেলে ব্যবহার থেমে নেই। তাতে ট্রেন চলাচলে চ্যুতি-বিচ্যুতিসহ নানা দুর্ঘটনা ঘটলেও ঠিকাদার আর কর্ম ব্যবস্থাপক রাশেদ লতিফের পকেট ঘন্টায় ঘন্টায় ফুলে ফেঁেপ উঠছে।

আর এই কারচুপি ঠেকাতে কর্ম ব্যবস্থাপক রাশেদ লতিফ ওয়ার্কসপে সাংবাদিক প্রবেশে বিধি নিষেধও আরোপ করেছেন। এমনকি তার মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননা। এ বিষয়ে কথা বলতে গত রবিবার দুপুরে ওয়ার্কসপে গেলে গেইটের নিরাপত্তারক্ষী এনামুল হক পরিচয় জানার পর সাংবাদিক প্রবেশে রাশেদ লতিফের বিধি-নিষেধের কথা বলেন।

এনামুল হক বলেন, স্যারকে ফোন করে আমাকে দেন উনি যাওয়ার অনুমতি দিলেই যেতে পারবেন। কিন্তু বার বার ফোন দিলেও তা রিসিভ করেননি রাশেদ লতিফ। অগত্যা সেদিন ফেরত আসতে হয়। পরের দিন সোমবার মেসেজ দিয়ে ফোন দিলে কল রিসিভের পর দেখা করার কারন জানতে চান। যা সাক্ষাতে বলব জানালে শেষে প্রবেশের অনুমতি দেন। সাক্ষাতে ওয়ার্কসপে যন্ত্রাংশ তৈরীর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বলেন, এ বিষয়ে কথা বলতে ঢাকায় রেল ভবনে আমার বিভাগীয় প্রধানের অনুমিত লাগবে। আমি কোন কথা বলবনা।

ঠিকাদারের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, বললাম তো এ বিষয়ে আমি কোন কথা বলব না। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঠিকাদার মোরশেদ আলম, সুভাষ ও সালাউদ্দিন চক্র নগরীর মোগলটুলি ও মাদারবাড়ির বিভিন্ন কারখানায় অদক্ষ শ্রমিক দিয়ে তৈরী নকল খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছে। যা ওয়ার্কসপের নামে চালিয়ে দিচ্ছে কর্ম ব্যবস্থাপক রাশেদ লতিফ।

অথচ ওয়ার্কসপে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবলসহ প্রয়োজনীয় সবরকম খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরীর সক্ষমতা রয়েছে। ওয়ার্কসপে কর্মরত এক কর্মকর্তা জানান, ট্রেনে বগির দরজায় ব্যবহৃত কব্জা, লোহার নাটবল্টু, দরজার হুক, চাকার স্প্রীং, লোহার পাতসহ ৫৬ হাজার আইটেমের খুচরা যন্ত্রাংশ লাগে। যা তৈরীর ক্ষমতা ওয়ার্কসপে রয়েছে। কিন্তু নকল যন্ত্রাংশ আনায় ওয়ার্কসপ পুরো অচল হয়ে পড়েছে। গত ৮-১০ বছর ধরে ওয়ার্কসপে কোনো যন্ত্রাংশ তৈরী হচ্ছে না। এতে ওয়ার্কসপে কর্মরত দক্ষ শ্রমিকরা বিনাকর্মে সরকারের কোটি কোটি টাকা বেতন নিচ্ছে। আর পকেট ভারী হচ্ছে কর্ম ব্যবস্থাপকের। অন্যদিকে দুর্ঘটনায় কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে রেলের।

সূত্রমতে, রেলের উর্র্ধ্বতন কোন কর্মকর্তা বা মন্ত্রী-সচিব পর্যায়ের কেউ ওয়ার্কসপ পরিদর্শনে আসলে সেদিন শ্রমিকদের দিয়ে কারখানার মেশিন চালু রাখে। কাজ দেখায়। কিন্তু এ বিষয়ে কেউ কিছু বলার সাহস পায় না।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঠিকাদার মোর্শেদ আলম বলেন, পাহাড়তলী ওয়ার্কসপে বিগত দশ/বারো বছরের মধ্যে কোন যন্ত্রাংশ তৈরি হয়নি। নগরীর মাদারবাড়ি ও মোগলটুলির লোকাল ওয়ার্কসপে কারিগর দিয়ে রেলের খুচরা যন্ত্রাংশ আমরা তৈরি করি। জুবলি রোডে কিছু লোকাল ওয়ার্কসপেও তৈরি করা হয়।

তিনি বলেন, এলটিএমে বেশি অর্ডার দেয়া হয়। কারণ রেলের ক্রাইসিস মৌসুম থাকে। আমি লোকাল ওয়ার্কশপ থেকে রেলের যন্ত্রাংশ আগেভাগে তৈরি করে রাখি। কারণ আমি বুঝি কখন কি লাগবে। তাই রেলের কর্মকর্তারা আমাকে কাজ দেন। রেলে ৫৬ হাজার আইটেম আছে। একেক স্থানে একেক রকম লাগে। তারা স্যা¤পল দেয় আমরা তৈরি করে দিই। পনেরো বছরের অধিক সময় ধরে ওয়ার্কশপে।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে এক বছরে তিন কোটি ৯৭ লাখ ২৩ হাজার ১২৮ টাকার খুচরা যন্ত্রাংশ কিনেছে ওয়ার্কস ম্যানেজার। এরমধ্যে জানুয়ারি মাসে ৯০ লাখ ৯১ হাজার ২৫০ টাকা। এর দুইমাস পর মার্চ মাসে ৭৪ লাখ ৫৭ হাজার ৪২০ টাকা। মে মাসে ৮১ লাখ ৬৫ হাজার ১৮ টাকা, জুলাই মাসে ৬৩ লাখ ৩৩ হাজার ১৯০ ও আগস্ট মাসে ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার ২৫০ টাকার খুচরা যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে এলটিএমে।

এর আগে ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে ৩৭ লাখ ৬৬ হাজার টাকার খুচরা যন্ত্রাংশ ক্রয় করা হয়। এভাবে সারাবছরই চলছে কেনাকাটা। এরমধ্যে বেশিরভাগ অর্ডার দেয়া হয়েছে মোর্শেদ-সুভাষ সিন্ডিকেটকে। যেমন ২০১৮ সালের ১৫ মে মোর্শেদের দুটি লাইসেন্স মোর্শেদ এন্টারপ্রাইজ ও তার স্ত্রীর নামে করা লাইসেন্স তাসলিমা আলমের অনুকূলে একদিনে ৬১ লাখ ৪৮ হাজার ৩০০ টাকার খুচরা যন্ত্রাংশের অর্ডার দেয়া হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী রেলের ব্যবহৃত পণ্য কেনার পর স্টোরে মজুদ করার কথা। স্টোরে দায়িত্বরত কর্মকর্তা পণ্যের গুনগত মান পরিদর্শন করে মজুদ করবেন। পরবর্তীতে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করবেন। কিন্তু সরকারি কোষাগারের বিপুল অর্থ ব্যয়ে খোলাবাজারে তৈরি এসব যন্ত্রাংশ স্টোর রুমে রাখা কিংবা গুনগত মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

শুভ চট্টগ্রাম/ইখ