নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রামে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলে পাঠাচ্ছে না অভিভাবকরা। ফলে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। দিন দিন এ সংখ্যা আরো কমছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।

তবে করোনাভাইরাসে আতঙ্কিত হওয়ার মত এখনো সে রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। তবুও এমন কথায় নির্ভার থাকতে পারছেন না অভিভাবকরা।

অভিভাবকরা বলছেন, চীন ও ইতালিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাস যেভাবে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, তাতে এ মুহূর্তে কোনরকম ঝুঁকি না নেওয়াই ভালো। গতকালও দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত দু‘জন শনাক্ত হয়েছেন।

বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তথ্যমতে, গত কয়েকদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেকটা কমে গেছে। বিশেষ করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন ও মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে মূলত বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির সংখ্যা কমছে।

১৫ মার্চ রোববার সকালে নগরীর কাপাসগোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক জানান, অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের করোনার ভয়ে স্কুলে আনতে চান না। কেউ দুইদিন পর কেউ তিন দিন পর স্কুলে তাদের সন্তান নিয়ে আসছেন। প্রায় শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা মাস্ক পরে বাইরে বের হচ্ছেন। যতটা সম্ভব সর্তকতার সঙ্গেই বাইরে চলাফেরা করছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার দাবি জানান বেশিরভাগ অভিভাবক।

কাপাসগোলা সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নুর নাহার বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বে মানুষ মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশেও করোনা আক্রান্ত তিন জন শনাক্ত হয়েছে শুনেছি। আতঙ্কের মধ্যে আছি। তাই মেয়েকে নিয়মিত স্কুলে আনছি না। কিন্তু ক্লাস টেস্টের কারণে এখন আনতে হচ্ছে। পরীক্ষা তো বাদ দেওয়া যাবে না। তবে স্কুলগুলো কিছুদিনের জন্য বন্ধ দেওয়া হলে সবচেয়ে ভাল হতো।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামের কেউ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া না গেলেও চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বাইরের দেশ থেকে প্রতিদিন মানুষ যাওয়া-আসা করছে। তারা যদি কোনোভাবে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকে, তাদের থেকে এই ভাইরাস ছড়াবে না কে বলতে পারে। তাই আগে থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করা ভালো। স্কুল বন্ধ দিলে অন্তত ছেলেমেয়ে নিয়ে নিরাপদে বাসায় থাকা যেতো।

নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় অবস্থিত চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, করোনাভাইরাসকে ইতোমধ্যে মহামারী ঘোষণা করেছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। ফলে ভাইরাসটি এখন আমাদের জন্য বড় রকমের আতঙ্ক। একবার আক্রান্ত হলে আর নিস্তার নাই।

তিনি বলেন, আমার ছেলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। যেকোনো রোগ বাচ্চাদের শরীরেই আগে প্রবেশ করে। তাকে নিয়ে বাইরে বের হলেই ভয় লাগে। কিন্তু স্কুলগুলো তো বন্ধ ঘোষণা করছে না। গত দুইদিন স্কুলে নিয়ে আসিনি। কিন্তু লেখাপড়ার কথা চিন্তা করে আজ নিয়ে এসেছি। কারণ কয়েকদিন পর আবার পরীক্ষা শুরু হবে। অনুপস্থিত থাকলে তো পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়বে। কী করবো বুঝতে পারছি না। স্কুলে না আসলে পড়ার সমস্যা, আবার আসলে করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক।

তিনি আরও বলেন, রোববারের পত্রিকায় দেখেছি দেশে আরো দু‘জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে। ইতালিফেরত একজন শিক্ষক কোনও পরীক্ষা না করেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। যদি তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকে তাহলে তো এই ভাইরাস ছড়িয়ে পুরো চট্টগ্রাম শহরে ছড়িয়ে পড়তে দেরি হবে না।

ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শাহেদা আক্তার বলেন, অন্যান্য স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির হার কমমে যাওয়ার কথা শুনেছি। কিন্তু আমাদের স্কুলে উপস্থিতি ঠিক আগের মতোই। আতঙ্ক তো সবার মধ্যে আছে। তাছাড়া স্কুল বন্ধ রাখার কোনও নির্দেশনা এখনও পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পায়নি।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের (আইইডিসিআর) মহাপরিচালক বলেছেন করোনাভাইরাস নিয়ে বাংলাদেশে এখন যে পরিস্থিতি বিদ্যমান তাতে কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার পরিস্থিতি হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার প্রয়োজন হলে তারা আমাদের জানাবেন। অনেক ধরনের গুজব ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। যতক্ষণ পর্যন্ত বিশেষজ্ঞদের মতামত না পাবো ততক্ষণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হবে না।