বিশেষ প্রতিবেদক :

দেশজুড়ে তোলপাড় হওয়া অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী হত্যা মামলায় আপিল বিভাগে ৩ আসামির মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আপিল বিভাগ। আর এই রায় শুনে স্তব্ধ তার সহধর্মিণী উমা মুহুরী।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী হত্যা মামলার এই রায় শুনে ১৯ বছর ধরে চোখের সামনে স্বামী খুন হওয়ার রক্তাক্ত, দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়ানো উমা মুহুরী সাংবাদিকদের সঙ্গে তেমন কোনো কথা বলেননি। চোখেমুখে হতাশা নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন শুধু।

রায়ের পর মুহুরী হত্যা মামলার বাদী উমা মুহুরীর প্রতিক্রিয়া জানতে নগরীর জামালখানে তার বাসায় ভিড় করেন গণমাধ্যমকর্মীরা। সাংবাদিকদের সামনে এলেও রায় নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

বারবার অনুরোধের পর উমা মুহুরী বলেন, ‘হাইকোর্টে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড বহাল ছিল। এখন আদালত যাবজ্জীবন দিয়েছেন। আমার কিছু বলার নেই। যার এরকম হয়েছে, হারিয়েছে তারাই কেবল জানে কষ্ট কী। উমা মুহুরীর তিন সন্তানের মধ্যে এক ছেলে ও এক মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। আরেক মেয়ে থাকেন ঢাকায়। বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে আপিল বিভাগের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় মানবাধিকারকর্মী মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দাশ গুপ্ত বলেন, ‘আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড রদ করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন। এ রায়ের ফলে তারা মৃত্যু পর্যন্ত আর কারাগার থেকে বের হতে পারবেন না। এ রায়কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে হবে না। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কারাগারে রাখা, তারপর মুক্ত। আমৃত্যু কারাদণ্ড মানে হচ্ছে মৃত্যুর আগপর্যন্ত আর মুক্তি নেই।

তবে একটি কথা আছে, যদি আসামিদের প্রতি সহানুভূতিশীল রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন ফাঁসির আসামি যে প্রক্রিয়ায় মুক্তি পাচ্ছে, তারাও সেই প্রক্রিয়ায় মুক্ত হয়ে যেতে পারে। এই আশঙ্কাটা থেকে যায়। অন্যথায় এই দণ্ড ফাঁসির চেয়ে কম নয়।’

বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০১ সালের ১৬ নভেম্বর সকালে চট্টগ্রাম নগরীর জামাল খান এলাকায় নাজিরহাট কলেজের অধ্যক্ষ গোপাল মুহুরীর বাসায় ঢুকে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যা করে। সর্বজনশ্রদ্ধেয় এই শিক্ষককে হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরাসহ সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।

গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীকে হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের তৎকালীন অডিট কর্মকর্তা উমা মুহুরী বাদী হয়ে নগরীর কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেছিলেন। ২০০৩ সালের জানুয়ারি মাসে মামলাটি নিয়মিত আদালত থেকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হলে বিচারে গতি আসে।

২০০৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল থেকে চার আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ আসে। একই রায়ে আরও চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। চার জন খালাস পান।

রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি হলেন—শিবির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী নাছির ওরফে গিট্টু নাছির, আজম, আলমগীর কবির ওরফে বাইট্ট্যা আলমগীর ও তছলিমউদ্দিন মন্টু। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় সাইফুল ইসলাম ওরফে সাইফুল, মো. শাহজাহান, মহিউদ্দিন ওরফে মহিন উদ্দিন (পলাতক) ও হাবিব খানকে (পলাতক)। খালাস পান নাজিরহাট কলেজের অধ্যাপক মো. ইদ্রিছ মিয়া চৌধুরী, অধ্যাপক মো. জহুরুল হক, অধ্যাপক তফাজ্জল আহম্মদ ও দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার নাসির।

২০০৪ সালের জুনে নিজ বাসায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন সাইফুল। ২০০৫ সালের মার্চে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নাছির ওরফে গিট্টু নাছির র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। ২০০৬ সালের ১৭, ১৮ ও ১৯ জুলাই হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানির ওপর রায় দেন। এতে আজম, আলমগীর কবির ও তছলিমউদ্দিন মন্টুর মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। বিচারিক আদালত থেকে খালাস চার জনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেছিলেন বাদি উমা মুহুরী। সেই আপিল খারিজ হয়েছিল।

২০০৮ সালে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আলমগীর আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করেন। আর দু’জন তসলিম উদ্দিন মন্টু ও আজম ২০০৬ সালে জেল পিটিশন করেন। আপিল বিভাগ এসব আপিল খারিজ করে দিয়েছেন।