বিশেষ প্রতিনিধি:
নারায়ণগঞ্জের বায়তুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে দেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্যাসের লিকেজ লাইন। যদিও গ্যাস লাইন লিকেজের কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে কি’না তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তবে গত বছর ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম মহানগরীর পাথরঘাটার ব্রিকফিল্ড রোডের বড়ুয়া ভবনে ঘটে এমনই এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ। সেই বিস্ফোরণে সাতজনের প্রাণহানি ঘটে। ঘটনার পর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস রাইজারের লিকেজ থেকেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।’

ঠিক এই ঘটনার পরপরই গ্যাস লাইন বিস্ফোরণের ভয়াবহ দুর্ঘটনা এড়াতে গ্যাসের রাইজার পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেয় কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কো¤পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)। কিন্তু করোনাকাল শুরুর পর থেকে বন্ধ হয়ে যায় রাইজারের লিকেজ পরীক্ষা। যা নারায়াণগঞ্জ বিস্ফোরণের পর নতুন করে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেজিডিসিএল’র মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস) প্রকৌশলী মো. সারওয়ার হোসেন বলেন, গ্যাস আবদ্ধ অবস্থায় জমা হলে ইলেক্ট্রিক ¯পার্ক বা আগুনের সংস্পর্শ পেলেই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। তাই গ্যাসজনিত ভয়ঙ্কর এসব বিস্ফোরণ এড়াতে প্রথমেই প্রয়োজন উন্মুক্ত স্থানে রাইজার ও গ্যাস লাইন স্থাপন করা। এতে করে লিকেজ লাইন থেকে বের হওয়া গ্যাস সহজেই উপরের দিকে উঠে যেতে পারে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকেনা। এসব বিষয়ে সচেতন করতে নগরজুড়ে অনেক প্রচারণা চালিয়েছি আমরা।

তিনি আরো বলেন, নগরীর পাথরঘাটায় বিস্ফোরণের পর গ্যাস রাইজারের লিকেজ পরীক্ষায় শতাধিক প্রকৌশলী ও ৪০ জন মেরামত কর্মীর সমন্বয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রাইজার চিহ্নিত করতে এলাকাভিত্তিক ৬টি টিম গঠন করা হয়। ওই সময়ে পাথরঘাটা এলাকায় ৮২৬টি রাইজারের লিকেজ পরীক্ষা করা হয়। এরমধ্যে ১৩টি রাইজার পাওয়া যায় বড়য়া ভবনের মতো ভবনের অভ্যন্তরে আবদ্ধ অবস্থায়। ২৬টি রাইজার পাওয়া যায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। তাছাড়া লিকেজ অবস্থায় রাইজার পাওয়া যায় প্রায় ২০টি। লিকেজগুলো তাৎক্ষণিক মেরামতের পর ভবনে এসব ঝুঁকিপূর্ণ লাইন-রাইজার অপসারণে মালিকদের নোটিশ দেওয়া হয়।

চলতি বছরের মার্চের প্রথম দিন থেকে নতুন করে দ্ধিতীয় দফায় গ্যাস রাইজার-লাইন পরীক্ষার কাজ শুরু হয়। ওই সময়ে নগরীর বিশ্বরোড, কৈবল্যধাম, একেখানসহ এর আশপাশের এলাকায় গ্যাস লাইন পরীক্ষা করে কেজিডিসিএল’র ৬টি টিম। এতে ১ হাজার ৩৫টি গ্রাহকের (কিচেন) গ্যাস লাইনের লিকেজ পরীক্ষা করা হয়। এতে লিকেজ পাওয়া যায় অন্তত ৩০টি লাইন। তাছাড়া অবৈধভাবে সংযোগ নেওয়ার কারণে কেটে দেওয়া হয় ১টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও ৪টি কর্মাশিয়াল লাইন।

কিন্তু মার্চের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে হানা দেয় করোনাভাইরাস। প্রথম থেকেই আশঙ্কা ছিল চট্টগ্রাম হবে করোনা সংক্রমণের তীর্থস্থান। এমন শঙ্কার মুখে ১৬ মার্চ থেকে বন্ধ হয়ে যায় চট্টগ্রামে ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস লাইন-রাইজার চিহ্নিত করণের চলমান কাজ। তবে কোনো রাইজারের লিকেজ বা কোনো ধরনের সমস্যা পেলে তৎক্ষণাৎ প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ মেরামত করে দেওয়া হয়।

এরমধ্যে নারায়ণগঞ্জ বিস্ফোরণের ঘটনায় চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্যাসের রাইজার লিকেজ পরীক্ষার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। এ নিয়ে কর্ণফুলী গ্যাসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও ভাবিয়ে তুলেছে।

সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম মহানগরীতে বর্তমানে ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৯৮৫টি আবাসিক বার্নার রয়েছে। এজন্য ২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার সরবরাহ লাইন ব্যবহার করা হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ, সংযোগ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য রাইজার রয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার। এসব গ্যাস লাইন শতভাগ পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজটি স¤পন্ন করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম মহানগরীর পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড এলাকার বড়ুয়া ভবনের নিচতলায় গ্যাস বিস্ফোরণে ৭ জন নিহত ও ১০ জন আহত হয়। ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস রাইজার থেকে বিপুল পরিমাণ গ্যাস জমা হয়ে ভবনের ২ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করে। সেখানে সকালে পূজার জন্য জ্বালানো ম্যাচের কাঠি থেকে এই বিস্ফোরণ ঘটে। যা মুহূর্তেই ঘরের রাস্তার পাশের দেয়াল ও পূর্ব পাশের দেয়াল উড়িয়ে নিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়।