বিশেষ প্রতিবেদক :
বাঁশখালী আসনের এমপি মোস্তাাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ফুঁসছে চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধারা। সংসদ সদস্যপদ বাতিল ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কারের দাবিসহ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাত দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছেন তারা।

অন্যথায় সারাদেশের জেলা-উপজেলা থেকে একযোগে ঢাকামুখী লংমার্চসহ সড়ক অবরোধ করা হবে বলে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। গতকাল চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্ত্বরে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা কমিটি আয়োজিত সর্বশেষ বিক্ষোভ সমাবেশে এ দাবি জানান।

সমাবেশ শেষে এমপি মোস্তাফিজের কুশপুত্তলিকা দাহ ও বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। এর আগে মোস্তাফিজের সংসদ সদস্যপদ বাতিল ও দল থেকে বহিষ্কারের দাবিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে স্মারকলিপিও প্রদান করেন মুক্তিযোদ্ধারা।

শুধু তাই নয়, চট্টগ্রামের পটিয়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী উপজেলা পর্যায়েও মানববন্ধন কর্মসূচিসহ সংশ্লিষ্ট ইউএনওর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন উপজেলা পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধারা।

গত ২৪ আগস্ট চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর হামলার নির্দেশদাতা হিসেবে বাঁশখালীর এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদ সন্তান কমান্ড, ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের কয়েকটি অঙ্গ সংগঠন।

অবশ্যই এই বিরোধের গোড়াপত্তন ঘটে বাঁশখালী উপজেলা থেকে। সেখানে গত ২৭ জুলাই প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক স¤পাদক ডা. আলী আশরাফের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করার অভিযোগ উঠে। সৈয়দ আলী আশরাফ বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর চট্টগ্রামে প্রথম প্রতিবাদকারী মৌলভী সৈয়দের বড় ভাই। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন বাঁশখালীর মৃুক্তিযোদ্ধারা। এ জন্য তারা এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীকে দোষারোপ করেন।

এমনকি এ ঘটনায় বাঁশখালী উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড ও মুক্তিযোদ্ধাদের মানববন্ধন কর্মসূচিতেও হামলা চালানো হয়। সংসদ সদস্যের নির্দেশে তার পেটুয়াবাহিনী এই হামলা চালায় বলে অভিযোগ তোলা হয়। এসব ঘটনায় এমপি মোস্তাফিজুর রহমান একাত্তর সালে বাঁশখালীতে কোন মুক্তিযোদ্ধ হয়নি বলেও মন্তব্য করেন। এতে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝেও।

ফলে চট্টগ্রাম মক্তিযোদ্ধা সংসদ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড চট্টগ্রাম মহানগর শাখা চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে প্রতিবিাদ কর্মসূচি হিসেবে মানবন্ধন ও সমাবেশ করে। এতেও হামলা চালানো হয়। এ সময় মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিকসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়।

এ ঘটনায় বাঁশখালীর এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী একেএম মোস্তাফিজুর রহমান রাসেলসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ দলীয় বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন সম্মিলিতভাবে মাঠে নামে এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে। যারা এর চুড়ান্ত ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট রানা দাশ গুপ্ত এ প্রসঙ্গে বলেন, মোস্তাফিজ ও তার পরিবার মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতা বিরোধী ছিল। না হলে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হয়ে তিনি বাংলাদেশের বাঁশখালীতে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি এমন মন্তব্য করতে পারে না। স্বাধীনতার স্বপক্ষের দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় একজন সাংসদ স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করে পার পেয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস পৌঁছাবে না। তাই সরকারের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকারী এই সাংসদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

চট্টগ্রাম মহানগর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর আহমদ বলেন, ২৪ আগস্ট আমরা মুক্তিযোদ্ধারা শান্তিপূর্ণভাবে মানববন্ধন করছিলাম। এমন সময় বাঁশখালীর কুলাঙ্গার মোস্তাফিজের পেটোয়াবাহিনী বয়স্ক মুক্তিযোদ্ধাদের উপর অতর্কিত হামলা করে। এর প্রতিবাদে সারাদেশে মুক্তিযোদ্ধারা বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। দেশের প্রতিটি জেলায় মুক্তিযোদ্ধারা রাজপথে নেমেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত মোস্তাফিজের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হবে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা রাজপথ ছাড়বো না। প্রয়োজনে সারাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে বাংলার রাজপথে দূর্বার আন্দোলন গড়ে তুলব।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষনা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগের একজন সাংসদ হয়েও মোস্তাফিজ বারবার বলেছেন বাঁশখালীতে কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। বাঁশখালীতে যদি মুক্তিযুদ্ধ না হয় তাহলে মৌলভী সৈয়দ, সুলতানুল কবির চৌধুরী ও আবু ইউসুফ চৌধুরীরা কোথায় মুক্তিযুদ্ধ করেছেন সেটা আমি সাংসদ মোস্তাফিজের কাছ থেকে জানতে চাই। আমি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এবং দক্ষিণ জেলা নেতৃবৃন্দের কাছে অনুরোধ করছি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকারী এমন ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগের রাখা ঠিক না। অনতিবিলম্বে তাকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হোক।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বাঁশখালীর এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। জানা গেছে তিনি অসুস্থ। করোনাকালে তিনি স্বপরিবারে করোনা সংক্রমিত হয়েছিলেন।