বিশেষ প্রতিবেদক:
বৃষ্টিতে নয়, জোয়ারের পানিতে দিনে দু‘বার ডুবছে চট্টগ্রাম। এরমধ্যে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত প্রথমবার, রাত ৯টা থেকে ভোর ৩টা পর্যন্ত দ্বিতীয়বার ডুবছে। গত চার দিন ধরে এ অবস্থা প্রকট হয়ে উঠেছে। এতে চরম দুর্ভোগের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবিরতা নেমে এসেছে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী ও তৃণমুল এনডিএমের চেয়ারম্যান খোকন চৌধুরী এ জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের নানা অনিয়ম ও দূর্নীতিকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ঘুর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস ও বঙ্গোপসাগরের প্রবল জোয়ার থেকে রক্ষায় নির্মিত উপকুলীয় বেড়িবাঁধ ও বিভিন্ন সংযোগ খালের স্লুইসগেইট দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকছে চট্টগ্রামে।

তার দাবি, উপকুলীয় বেড়িবাঁধ ও স্লুইসগেইট নির্মাণে পাউবোর ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির কারনে স্বাভাবিক জোয়ারের পানি থেকেও রক্ষা পাচ্ছে না চট্টগ্রাম। বর্তমানে চট্টগ্রামের মহানগর ও জেলার ১৫ উপজেলার মধ্যে ১৩ উপজেলা জোয়ারের পানিতে ডুবছে।

তিনি বলেন, গত ৪-৫ দিন ধরে চট্টগ্রামে বৃষ্টি হলেও তা খুবই সামান্য। এই বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের মাটি ভিজেছে মাত্র। কিন্তু বঙ্গোপসাগরে জোয়ারের পানি উপকুলীয় বাঁধ দিয়ে ঢুকে নগরীর হালিশহর, আগ্রাবাদ, ডবলমুরিং, পাহাড়তলী, সীতাকুন্ড, আনোয়ারা, বাঁশখালী, মীরসরাই ডুবছে। কর্ণফুলী নদী দিয়ে ঢুকে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ, ফিশারী ঘাট, কোতোয়ালী, চান্দগাঁও, চকবাজার, বাকলিয়া, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী, পটিয়া, কর্ণফুলী উপজেলা ডুবছে। হালদা নদী দিয়ে পানি ঢুকে হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলার বিস্তিীর্ণ এলাকা ডুবছে। সাঙ্গু নদী দিয়ে পানি ঢুকে চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ডুবছে।

অথচ এসব এলাকা রক্ষায় চট্টগ্রামের মীরসরাই থেকে বাঁশখালী পর্যন্ত প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য সুউচ্চ উপকুলীয় বেড়ি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। যার উচ্চতা চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গায় শহর থেকে প্রায় ২০ ফুট, সমুদ্র উপকুল থেকে প্রায় ৩০-৪০ ফুট উচু। সীতাকুন্ড, মীরসরাই, আনোয়ারা, বাঁশখালী এলাকায় ১৫-২০ ফুট উচু। এ বাঁধ নির্মাণের পেছনে খন্ডখন্ড ভাবে ব্যয় হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। যা পাউবোর তত্ত্ববধানে হয়েছে।

আর সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে এ বাঁধ নির্মাণ করায় বাঁধ নির্মাণের লক্ষ্যই পূরণ হয়নি। সুউচ্চ ও নয়নাভিরাম বাঁধ নির্মাণে চট্টগ্রাম শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত খালগুলোর উপর যেসব স্লইসগেইট তৈরী করা হয়েছে তাতে জোয়ারের পানি ধরে রাখার ক্ষমতা নেই। এমনকি স্লুইসগেইটগুলো পরিচালনায় জনবল নিয়োগ দেওয়া হলেও তারা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রীয়।

সূত্রমতে, জোয়ারের সময় স্লুইসগেইটগুলো বন্ধ এবং জোয়ার নেমে গেলে তা খুলে দেওয়ার জন্য পাউবোর অধিনে লোকবল নিয়োগ রয়েছে। কিন্তু এলাকার লোকজন স্লুইসগেইট উঠানো-নামানোর কাজে কোন লোককে কখনো দেখেনি। ফলে স্লুইসগেইটগুলো সবসময় খোলা থাকে। এতে সাগর থেকে জোয়ারের পানি ইচ্ছামতো ঢুকে আর নামে। তাতে চট্টগ্রাম শহর ডুবে যাই। এছাড়া সীতাকুন্ড, মীরসরাই ও আনোয়ারা উপকুলীয় এলাকায় অধিকাংশ বেড়ি বাঁধ জোয়ারের পানিতে বিলীন হয়ে গেছে। এরমধ্যে গত বছর নির্মাণ হয়েছে বাঁধের এমন অংশও আছে। বিলীন অংশ দিয়ে পানি ঢুকে এসব উপজেলার ফসলি জমি, মাঠ, ঘাট এবং জনবসতি ডুবছে। পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির ফলে বাঁধ নির্মাণের পরপরই জোয়ারের পানির ধাক্কায় এসব অংশ বিলীন হয়ে গেছে।

একইভাবে কর্ণফুলী নদীতে জোয়ারের পানি উপচে নগরীর বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ, ফিশারীঘটি, সদরঘাট, আগ্রাবাদ, বাকলিয়া চকবাজার, চান্দগাঁও, কর্ণফুলী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, পটিয়া এলাকা ডুবছে। হালদা নদী দিয়ে ডুবছে হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি। কর্ণফুলী নদীর সংযোগস্থলে থাকা খালের স্লুইসগেইটগুলো পরিচালনা ও সংরক্ষণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোন দায়িত্ব নেই। যা থেকে সহজেই অনুমেয় চট্টগ্রাম শহর ডুবে যাওয়া ও জলাবদ্ধতার জন্য অন্তরালে দায়ী পাউবো।

খোকন চৌধুরী বলেন, সমস্যার গভীরে না গিয়ে আমরা নগরীর খাল-নালায় জলাবদ্ধতা নিয়ে টানাটানি করছি। নানা কথা বলছি। যা কাকে কান নিয়ে যাওয়ার মতোই। সম্প্রতি জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রামের সড়কগুলো উচু করা হলেও শহর নিচু রয়ে গেছে ঠিকই। বরং উচু সড়কের কারনে জলাবদ্ধতা আরো বেড়ে গিয়ে পানিতে থৈ থৈ করছে চট্টগ্রাম শহর।

তিনি বলেন, নগরীর পয়নিষ্কাশনে খাল-নালার গভীরতা বাড়ানো যেমন দরকার, তেমনি জলাবদ্ধতা নিরসনে দরকার জোয়ারের পানির প্রবেশ ঠেকানো। কারণ গত চারদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগর ও ১৩টি উপজেলা পানিতে ডুবছে শুধুমাত্র জোয়ারের পানিতে। এ সময়ে উল্লেখযোগ্য তেমন বৃষ্টি হয়নি। গুড়ি গুড়ি বা মাঝারি আকারে যে বৃষ্টি হয়েছে তা সামান্যই। এ নিয়েও আমরা বলছি সামান্য বৃষ্টিতেও ডুবেছে চট্টগ্রাম। মূলত বৃষ্টিতে নয় জোয়ারের পানিতে ডুবছে চট্টগ্রাম। বৃষ্টির সময়ও জোয়ারের পানির তোড়ে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। আর তাতে নগরীর জীবনযাত্রায় দুর্ভোগ নেমে আসে। স্থবির হয়ে পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য। তাতে প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে শত কোটি টাকা।

খাতুনগঞ্জ হামিদউল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, প্রতিমাসে অমাবস্যা-পূর্ণিমায় জোয়ারের পানিতে ১০-১২ দিন ডুবে থাকে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ। এতে স্থবির হয়ে পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য। পানিতে ডুবে নষ্ট হয় গুদামে থাকা নানা ভোগ্যপণ্য। তাতে প্রতিদিন ১০ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়। নগরীর চাক্তাই খাল দিয়ে পানি ঢুকে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ ডুবে যাই বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, চাক্তাই ও মহেশখাল কেটে গভীরতা বাড়ানোসহ নির্মাণাধীন স্লুইসগেইটের কাজ দ্রুত শেষ করলে পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা পেত নগরীর এই বাণিজ্যকেন্দ্র। সচল থাকত ব্যবসা-বাণিজ্য। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড স্লুইসগেইটের নির্মাণ কাজও করছে খুব ধীরগতিতে। তিনি এ সময় কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের দাবিও জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাউবো চট্টগ্রামের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভুঁইয়া বলেন, যেখানে যেখানে উপকুলীয় বাঁধ বিধ্বস্ত রয়েছে সেখানে দিয়ে জোয়োরের পানি প্রবেশ করে চট্টগ্রাম ডুবছে। এছাড়া অনেকগুলো স্লুইসগেইট অকেজো। এগুলো দিয়েও পানি ঢুকছে। বিধ্বস্ত বাঁধ ও স্লুইসগেইট নির্মাণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুমোদন পেলেই বাঁধ ও স্লুইসগেইট নির্মাণ কাজ শুরু করা হবে।

স্লুইসগেইট রক্ষনাবেক্ষণ ও পরিচালনায় নিয়োজিতদের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে ডিভিশন-১, ডিভিশন-২সহ বিভিন্ন ডিভিশনের অধীনে বাঁধ ও স্লুইসগেইট তত্ত্ববধান করা হয়। কোনটিতে কে কি রকম করছে সবগুলোর বিষয়ে বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে।

এদিকে রবিবারও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। পতেঙ্গা আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ উজ্জ্বল কান্তি পাল বলেন, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ১২-১৮ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। যা ঝড়ো হাওয়া আকারে ৪০-৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। স্বাভাবিক জোয়ারে ১-২ ফুট পানি উঠতে পারে। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা ৫২ মিনিট পর্যন্ত জোয়ার থাকাকালে বৃষ্টি এবং জোয়ারের পানির কারণে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে। চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত রয়েছে।