বিশেষ সংবাদদাতা:
চট্টগ্রামে পশুরহাটগুলোতে ক্রেতা নেই বললেই চলে। বেকার সময় কাটাচ্ছেন কামাররাও। যারা বিগত কোরবানির ব্যস্ততম দিনগুলির স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন এখন। ইজারাদাররাও করছেন রোমন্থন। অথচ কোরবানির বাকী আর মাত্র ৬দিন।

শনিবার সকালে চট্টগ্রাম মহানগরীর পশুরহাটের ইজারাদার, পশু বিক্রেতা ও কোরবানির জন্য প্রয়োজনীয় ধারালো উপকরণ তৈরীর কারিগর কামাররা শুনালেন স্মৃতির পাতার নানা কথা। কোরবানির আগের ১০ দিনের নানা ব্যস্ততার কথা জানিয়ে তারা বলেন, করোনায় পাল্টে গেছে মানুষের জীবন।

চট্টগ্রাম মহানগরীর বহদ্দারহাটের কামার অজয় কর্মকার (৩৪) এ বিষয়ে কথা বলার সময় গান গেয়ে উঠেন-গ্রামের নওজওয়ান, হিন্দু-মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম, আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম। কিন্তু সেই দিন আর কোথায়। গত বছর এমন দিনেও তো এই গান মনে করার ফুরসৎ ছিল না। আর এখন গান গাইতে গাইতে ঝিমিয়ে পড়ছি-বললেন অজয় কর্মকার।

সত্যিই তো! জিলহজ্ব মাসের চাঁদ উঠার পর চট্টগ্রাম মহানগর কামারের দোকানের ঠুং-ঠাং শব্দে মুখর হয়ে উঠত। আশপাশের মানুষ রাতে ঘুমাতে পারত না। এখন সেই দিন কোথায় গেল? বললেন চট্টগ্রাম বহদ্দারহাট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি তসকির আহমেদ।

তিনি বলেন, কোরবানির আর মাত্র ৬ দিন বাকী থাকলেও নগরীর কোরবানি দাতাদের সাড়া মিলছে না। ফলে পশুর হাটেও ক্রেতা নেই। কারণ মানুষের পকেটে টাকা নেই। চট্টগ্রামে গত বছরের অর্ধেক মানুষ এবার কোরবানি দিতে পারবে না।

নগরীর বহদ্দাহাটের নিকটে বিবিরহাটের ইজারাদার আরিফুল ইসলাম জানান, হাটে দেশের িিবভন্ন স্থান থেকে গরু আসছে। কিন্তু ক্রেতা নেই এখনো। ফলে ব্যাপারীরা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। কখন একজন ক্রেতা আসবে চেয়ে থাকেন। দুয়েকজন ক্রেতা আসলেও বিক্রী নেই।

ব্যাপারীরা বলছেন, দুয়েকজন ক্রেতা পশুরহাটে আসলেও গরুর দাম বলছে কেনা মুল্যের চেয়েও ৫-১০ হাজার টাকা কম। তাই গরু বিক্রী হচ্ছে না। অথচ প্রতিবছর এ দিনে হাটের একেকজন বিক্রেতা ৮-১০টা করে গরু বিক্রী করেছেন।

চট্টগ্রামের সর্ববৃহৎ পশুর হাট সাগরিকা বাজারের গরু ব্যাপারী আশরাফ আলী বলেন, কুষ্টিয়া থেকে ২৫টি গরু এনেছি। ১ থেকে ২ লাখ টাকার মধ্যে একেকটা গরুর দাম। কিন্তু একটা গরুও বিক্রী হয়নি এখনো। দুয়েকজন ক্রেতা গরু দেখলেও দাম বলে কেনা মূল্যের চেয়ে ১০-১৫ হাজার টাকা কম। অথচ গত বছর এই বাজারে ৫৮টি গরু বিক্রী করেছি। আয় করেছি ৬ লাখ টাকা।

সাগরিকা পশুর হাটের ইজারাদার সাইফুল হুদা জাহাঙ্গীর বলেন, উত্তরবঙ্গ থেকে গরু আসছে। কিন্তু ক্রেতা নেই। দু‘একটা গরু বেচাকেনা হচ্ছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ইজারা মুল্যের অর্ধেকও উঠবে না। অথচ প্রতিবছর এই সময়ে ইজারার টাকা হাতে চলে আসে। তবে আশায় আছি। আরও ৬ দিন আছে। হয়তো এরমধ্যে হাট জমতে পারে। তবু এটাই সত্য যে, আগের সেই দিনগুলো আর পাচ্ছি না। মোটা অঙ্কের লাভ আর চোখে দেখছি না।

তিনি বলেন, পশুরহাটে ক্রেতা টানতে করোনা সংক্রমণ রোধে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে পশুরহাট বসানো হয়েছে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবক দেওয়া হয়েছে। ক্রেতা-বিক্রেতা ও কর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত মাস্ক, স্যানিটাইজার ও ¯েপ্র মেশিনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া নিরাপত্তার জন্য বসানো হয়েছে ৪০টি সিসিটিভি ক্যামেরা।

তবে সমস্যা করোনার ভয়ে নয়। করোনাকালে মানুষ নিংস্ব হয়ে গেছে। বিশেষ করে প্রবাসী পরিবারগুলোর আয় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে কোরবানির দেওয়ার ক্ষমতা অনেকেই হারিয়ে ফেলেছেন। ফলে পশুর হাটে ক্রেতা কম।

প্রসঙ্গত, কোরবানি উপলক্ষে এবার চট্টগ্রাম নগরীতে তিনটি স্থায়ী ও চারটি অস্থায়ীসহ মোট সাতটি হাট বসেছে। তিনটি স্থায়ী হাট হল-সাগরিকা, বিবিরাট ও পোস্তারপাড় ছাগলের হাট। অস্থায়ী হাটগুলো হল-নূরনগর হাউজিং সোসাইটি মাঠ, কমলমহাজন হাট, বাটারফ্লাই টিকে গ্রুপ মাঠ ও সল্টগোলা মাঠ।