নিজস্ব প্রতিবেদক :
বহুল আলোচিত ভারত-বাংলাদেশ ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি প্রায় দু‘বছর হল। এরমধ্যে গত ২১ জুলাই মঙ্গলবার ভোরে এই চুক্তির আওতায় ভারতীয় পণ্যের প্রথম চালান এসে পৌছে চট্টগ্রাম বন্দরে। বাংলাদেশের পণ্যবাহী জাহাজ এমবি সেজুঁতি এই চালান নিয়ে আসে।

পণ্যের মধ্যে ছিল দুই কনটেইনার রড। যার ওজন ছিল ৫৩.২৫ মেট্রিকটন। রডগুলো ছিল ত্রিপুরার জিরনিয়ার করপোরেশনের। আর দুই কনটেইনার ছিল ডাল। যার ওজন ৪৯.৮৩ মেট্রিকটন। এগুলো ছিল আসামের জেইন ট্রেডার্সের। আর এসব পণ্যের ট্রান্সশিপমেন্ট থেকে বাংলাদেশের কত আয় হল ব্যবসায়ী ও সমালোচকদের কৌতুহল তা নিয়ে।

কারন দেশীয় আমদানিকারকদের চেয়েও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার ও পণ্য পরিবহণে একটু বেশি সুবিধা পাচ্ছে ভারতীয় পণ্য। ২০১৮ সালের অক্টোবরে করা চুক্তির আর্টিক্যাল-৪এ বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ যে সুবিধা নিয়ে থাকে ভারতীয় পণ্যের ক্ষেত্রেও একই সুবিধা প্রদান করবে। তবে প্রায়োরিটির ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ¯েপস প্রদান করবে। এ নিয়ে চলে নানা আলোচনা-সমালোচনা।

ব্যবসায়ী ও সমালোচকদের মতে, ভারতীয় ট্রানশিপমেন্টের পণ্য পরিবহনে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পণ্য খালাসে ভারতীয় জাহাজ প্রায়োরিটি পাবে। তখন সেটা দেশীয় আমদানি-রপ্তানিকারকদের মালামাল খালাসে সময় বেশি লাগবে।

এখনো একমত পোষণ করেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ‘র সদস্য মো. ইলিয়াছ হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি পণ্য বুঝে পেতে এমনিতেই বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের অনেক সময় লাগে। ঈদ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বন্দরে জাহাজ জট, কনটেইনার জট লেগে যায়। যা কাটাতে কয়েকমাস সময় লেগে যায়। সেখানে যদি ভারতীয় জাহাজ আগ্রাধিকার পায় তাহলে দেশীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আর সব জল্পনা-কল্পনা ও সমালোচনা ছাড়িয়ে ট্রানশিপমেন্ট চুক্তির আওতায় কলকাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বন্দর ও হলদিয়া থেকে ২২১ কনটেইনার পণ্য নিয়ে বাংলাদেশের পণ্যবাহী জাহাজ এমবি সেজুঁতি গত ২১ জুলাই মঙ্গলবার ভোরে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌছে।

জাহাজটির স্থানীয় এজেন্ট ম্যাংগো শিপিং লাইনের ব্যবস্থাপক হাবিবুর রহমান জানান, জাহাজটিতে ২১৭ কনটেইনার পণ্য বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের। ৪ কনটেইনার পণ্যের দুই টিইইউস টিএমটি ই¯পাত পশ্চিম ত্রিপুরার জিরানিয়ার এসএম করপোরেশনের। দুই টিইইউস ডাল আসামের জেইন ট্রেডার্সের।

তিনি বলেন, জাহাজটি পৌছার পর জেটিতে বার্থিং দেওয়ার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়। পাশাপাশি কনটেইনার খালাসের লক্ষ্যে কাস্টমসসহ বিভিন্ন মাশুল পরিশোধ করা হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যা নাগাদ জাহাজ থেকে কনটেইনার খালাস শুরু করা হয়। এরপর কনটেইনারগুলো নিয়ে চারটি কাভার্ড ভ্যান ২২ জুলাই বুধবার দুপুরে আখাউরা স্থলবন্দরে পৌছে। সেখান থেকে বৃহস্পতিবার সকালে পণ্যগুলো ভারতের আগরতলায় পৌছে। আর এ থেকে বাংলাদেশের মোট আয় হয়েছে সাড়ে ৩ লাখ টাকা।

এরমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর পেয়েছে ৩০ হাজার ৮৯৯ টাকা। চট্টগ্রাম কাস্টমস পেয়েছে ১৩ হাজার ১০০ টাকা। জাহাজ ভাড়া বাবদ বাংলাদেশি জাহাজ এমভি সেঁজুতি আয় করেছে প্রায় দেড় লাখ। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যাপ্ত গাড়ি ভাড়া বাবদ পাওয়া গেছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এছাড়া বিভিন্ন চার্জ বাবদ বাংলাদেশ আরও ৩০ হাজার টাকা পেয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) মো. জাফর আলম বলেন, ভারতীয় পণ্যের পরীক্ষামূলক প্রথম চালানে চট্টগ্রাম বন্দর হ্যান্ডলিং, ক্রেন চার্জ, রিভার ডিউজ, সিঅ্যান্ডএফের মাশুল ও ভ্যাটসহ ৩০ হাজার ৮৯৯ টাকা আয় করেছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মো. ফখরুল আলম বলেন, পরীক্ষামূলক এই চালান থেকে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ প্রসেসিং মাশুল, ট্রান্সশিপমেন্ট মাশুল, নিরাপত্তা মাশুল, প্রশাসনিক মাশুল, এসকর্ট মাশুল, কন্টেইনার স্ক্যানিং মাশুল ও ইলেকট্রিক সিলের মাশুলসহ মোট ১৩ হাজার ১০০ টাকা পেয়েছে।

রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী ৬ ধরনের মাশুল আদায় করা হয়েছে। এরমধ্যে প্রতি চালানের প্রসেসিং মাশুল ৩০ টাকা, প্রতি টনের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট মাশুল ২০ টাকা, নিরাপত্তা মাশুল ১০০ টাকা, এসকর্ট মাশুল ৫০ টাকা, কনটেইনার স্ক্যানিং মাশুল ২৫৪ টাকা ও অন্যান্য প্রশাসনিক মাশুল ১০০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ট্রানশিপমেন্ট চুক্তি অনুযায়ী পণ্য পরিবহন বাবদ ভারতকে আলাদা কোনো মাশুল দিতে হচ্ছে না। এমনকি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের মাশুলও প্রযোজ্য হচ্ছেনা। উপকূলীয় এলাকায় চলাচল করা জাহাজ থেকে ৮টি খাতে মাশুল আদায় করা হলেও ভারতীয় পণ্যের প্রথম চালান থেকে পাঁচ খাতে মাশুল আদায় করা হয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন চার্জ বাবদ আদায় করা হয়েছে আরও ৩০ হাজার টাকা।

তবে সরকারি এ দুটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তির পণ্য পরিবহন করে প্রায় তিন লাখ টাকা আয় করেছে দেশের বেসরকারি খাত। বিশেষ করে জাহাজ ভাড়া ও সড়ক পরিবহন বাবদ অর্থ পাচ্ছে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান।