বিশেষ সংবাদদাতা:
বিদেশ যেতে কোভিড-১৯ নেগেটিভ সনদ নেয়া বাধ্যতামূলক। বিমানবন্দরে এই সনদ দেখিয়ে প্রবেশ করতে হবে। আগামী ২৩ জুলাই থেকে এই কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এ জন্য সরকার সারাদেশে ১৬টি পিসিআর ল্যাব নির্ধারণ করেছে। যার মধ্যে চট্টগ্রামে রয়েছে শুধুমাত্র একটি।

প্রতিষ্ঠানটি হচ্ছে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে অবস্থিত বিআইটিআইডি ল্যাব। একটি মাত্র ল্যাব হওয়ায় নানা ভোগান্তির শঙ্কায় পড়েছেন চট্টগ্রামের লক্ষাধিক প্রবাসীসহ বিদেশে যেতে ইচ্ছুকরা। অনেকের প্রশ্ন, দিনে ৩০০ নমুনা পরীক্ষার ক্ষমতা নিয়ে বিআইটিআইডি ল্যাব কতদিনে লক্ষাধিক প্রবাসীকে কোভিড-১৯ নেগেটিভ সনদ প্রদান করবে।

শুধু তাই নয়, নমুনা পরীক্ষার খরচ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক প্রবাসী। তাদের মতে, দেশের নাগরিকদের নমুনা পরীক্ষায় যেখানে ২০০-৫০০ টাকা, সেখানে প্রবাসীদের জন্য ৩৫০০-৪৫০০ টাকা কেন? যাকে চরম বৈষম্য বলছেন প্রবাসীরা। তাদের প্রশ্ন, প্রবাসীরা কি এদেশের নাগরিক নয়। নাকি শুধু রেমিটেন্স মেশিন?

চট্টগ্রাম হালিশহরের বাসিন্দা কাতার প্রবাসী রহমান, নিউইয়র্ক প্রবাসী কামাল উদ্দিন, হাটহাজারী উপজেলার সদরের বাসিন্দা দুবাই প্রবাসী আমিনুল, লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দা জমির উদ্দিন মুঠোফোনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, করোনায় দেশে লকডাউন শুরুর কয়েকদিন আগে দেশে বেড়াতে আসেন তারা। মাসখানেক পর চলে যাবেন। কিন্তু সেটা আর হলো না। টাকা পয়সাও ছিল মাসখানেক খরচের জন্য। এরপর অর্থসংকটে পড়েন তারা।

এখন তারা আত্নীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধার নিয়ে বা তাদের বাড়িতে পরিবার পরিজন নিয়ে খেয়ে না খেয়ে বেচে আছেন। ফলে ধারকর্জ হলেও বিদেশে যেতে মরিয়া তারা। এরমধ্যে শাহেদ-সাবরিনাকান্ডে কোভিড নেগেটিভ সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক করে দেয়। এ অবস্থায় সনদের জন্য ৩৫০০-৪৫০০ টাকা খরচ যেন মরার উপর খাড়ার ঘা। কারন কোন কোন প্রবাসী পরিবারে ৭-৮ জন সদস্যও আছেন।

এদিকে কোভিড-১৯ সনদ নিতে চট্টগ্রামে নির্ধারণ করা হয় শুধুমাত্র বিআইটিআইডি ল্যাবকে। যেখানে দিনে ৩০০ নমুনা পরীক্ষার ক্ষমতা আছে। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলায় ১৫ লক্ষাধিক প্রবাসীদের মধ্যে আটকা পড়া লক্ষাধিক প্রবাসীর সনদ দিতে কতদিন লাগতে পারে? এর আগে বিমান টিকেট ও পাসপোর্ট দিয়ে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে রেজিস্ট্রেশন ও নমুনা দিতে হবে। একটি মাত্র বুথ হওয়ায় যেখানে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাড়িয়ে থাকতে হবে। এতে ভোগান্তি হবেই। হবে আর্থিক ক্ষতিও-এমন মত প্রবাসীদের।

প্রবাসীরা বলেন, নমুনা পরীক্ষার জন্য চমেক, সিভাসু, চবি, বেসরকারি ই¤েপরিয়াল ও শেভরন ল্যাবে পিসিআর মেশিন রয়েছে। রয়েছে নগরসহ গ্রামগঞ্জের বিভিন্নস্থানে নমুনা সংগ্রহের বুথ। কিন্তু বিদ্যমান সুবিধার পুরোটা ব্যবহার না করে শুধুমাত্র জেনারেল হাসপাতালে একটি বুথে নমুনা সংগ্রহ এবং একটি ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা করে প্রাপ্ত রিপোর্ট নিয়েই বিদেশগামীদের ভ্রমণ করতে হবে। গ্রাম-গঞ্জের বহু লোকের পক্ষে নমুনা দিয়ে রিপোর্ট সংগ্রহ করে বিদেশ যাওয়া একটি অগ্নিপরীক্ষার মতো।

বিআইটিআইডি ল্যাবের প্রধান ডা. শাকিল আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান এটি, সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতেই হবে। জেলা সিভিল সার্জন অফিস থেকে নমুনা পাঠালে তা জরুরি ভিত্তিতে করে দেয়ার চেষ্টা করব। তবে কতটুকু চাপ সামলাতে পারবো তা এখন বলা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ল্যাবের দুইটি মেশিনে দৈনিক ৩০০ নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। সীমিত পরিসরের কারনে করোনাকালে প্রতিষ্ঠানটিকে ভয়াবহ নমুনাজট সামলাতে হয়েছে। এখন প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক বিদেশগামী মানুষের রিপোর্ট তৈরি করতে প্রতিষ্ঠানটিকে আবারো ভয়াবহ রকমের চাপে পড়তে হবে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, বিদেশগামীদের পাসপোর্ট, বিমান টিকেট দেখে রেজিস্ট্রেশন করবো। এরপর নমুনা সংগ্রহের জন্য জেনারেল হাসপাতালে পাঠাবো। নমুনা দিয়ে উনি চলে যাবেন। নমুনা বিআইটিআইডিতে পাঠাবো আমরা। রিপোর্ট আসলে রিপোর্ট প্রদান করবো। তিনি বলেন, আপাতত জেনারেল হাসপাতালের একটি বুথেই নমুনা সংগ্রহ করা হবে। চাপ বাড়লে সরকারি সিদ্ধান্তে বুথ বাড়ানো হতে পারে।

প্রসঙ্গত, বিদেশে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের কোভিড-১৯ পরীক্ষা সনদ প্রদানে হাসপাতাল ও ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ল্যাবে গিয়ে নমুনা দিলে সাড়ে ৩ হাজার, বাড়িতে নমুনা দিলে দিতে হবে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ রোকন উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এ তথ্য জানানো হয়।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিদেশগামীরা কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য নিজ জেলার সিভিল সার্জন অফিসে স্থাপিত বুথে নমুনা প্রদান করবেন। নমুনা প্রদানের পর থেকে যাত্রার সময় পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আবশ্যিকভাবে আইসোলেশনে থাকবেন। বিমান যাত্রার ৭২ ঘণ্টার আগে কোনো নমুনা সংগ্রহ করা হবে না। যাত্রার ২৪ ঘণ্টা পূর্বে রিপোর্ট ডেলিভারির ব্যবস্থা করা হবে।