বিশেষ সংবাদদাতা:
২০১৮ সালের মার্চ মাসের ঘটনা। খালিদ মোল্লার বয়স তখন ৩২। চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের উপকুলে ঝুমা এন্টারপ্রাইজ শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। এ সময় ইকতা নামক ট্যাংকার শ্রেণির একটি জাহাজের আটতলা সমান ভবনের উচ্চতা থেকে পড়ে মারা যান তিনি।

প্রায় ৩ লাখ টন ওজনের ওই জাহাজের মালিক ব্রিটিশ কোম্পানি মারান লিমিটেড। হাতবদল হয়ে এটি বাংলাদেশে আসে। এ জাহাজে খালিদ মোল্লার মৃত্যুর ঘটনায় গত ১৪ জুলাই লন্ডন আদালতের এক বিচারক তার রায়ে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ইকতা ভাঙ্গার সময় যে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার জন্য মারান অবহেলার দায় এড়াতে পারে না। তাই নিহতের বিধবা স্ত্রী হামিদা বেগম এই অভিযোগে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে পারবেন।

এর আগে যুক্তরাজ্যের আইনি অধিকার ও পরামর্শক সংস্থা লেইহ ডের সাহায্যে হামিদা বেগম লন্ডন হাইকোর্টে মামলার জন্য আপিল করেন। আর এই সংস্থার মাধ্যমে মামলা দায়েরের অনুমতির খবর পেয়ে যান হামিদা বেগম। ফলে লন্ডনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন হামিদা বেগম।

চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের জঙ্গল সলিমপুরের বাসিন্দা হামিদা বেগম বলেন, খালিদ মোল্লা লেখাপড়া জানতেন না। ২০০৯ সালের শুরুতে আমাকে নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে আসেন। তখন আমি গর্ভবতী। তার লক্ষ্য ছিল, জাহাজভাঙা কারখানায় কাজ নেওয়া। দিনে দিনে খালিদ মোল্লা জাহাজভাঙ্গা শিল্পের একনিষ্ঠ কর্মী হয়ে উঠেন। কিন্তু দৈত্যাকৃতির একটি জাহাজ কাটতে গিয়ে হঠাৎ পড়ে যান খালিদ মোল্লা। তাতে তার মৃত্যু ঘটে।

হামিদা বেগম বলেন, স্বামীর মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ হিসেবে সরকার ও ইয়ার্ড থেকে প্রায় ৬ লাখ টাকা পান। কিন্তু বেশিরভাগ টাকাই স্বামীর ভাইয়ের হাতে দিয়েছিলেন। যার বিনিময়ে তিনি ও তার ছেলের ভরণপোষণ ও আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিলেন। তবে দুর্ঘটনার এক বছর পর আমাকে চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়। তাই নগর ছেড়ে আমি সীতাকুন্ডের জঙ্গল সলিমপুরে চলে আসি। এ অবস্থায় লন্ডন হাইকোর্টে মামলা করার বিষয়টি আমাকে জানানো হয়। তাই আমি লন্ডন যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

এদিকে রায়ের পর প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যভিত্তিক মারান লিমিটেডের মূল মালিকানা গ্রিসের আঞ্জেইকোসুইস শিপিং গ্রুপের। বেসরকারি মালিকানায় থাকা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জাহাজ বহর রয়েছে তাদের। দুটি প্রতিষ্ঠানের কেউই খালিদ মোল্লাহর নিয়োগদাতা নয়। তবে পুরোনো জাহাজটি ভেঙ্গে ফেলার জন্য অধিক মুনাফার লোভে তারা জাহাজটি বাংলাদেশে আসার জন্য দায়ী বলে উল্লেখ করেন ব্রিটিশ আদালত।

আদালত বাংলাদেশের জাহাজভাঙ্গা শিল্পের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের কথা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট শিল্পে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রতিবছরই বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনায় হতাহত হচ্ছেন শতশত চুক্তিহীন শ্রমিক। ইকতাকে এমন পরিবেশে ভাঙ্গার মাধ্যমে শ্রমিকদের জীবন বিপন্ন হবে, একথা জানার পরও জাহাজটির সাবেক মালিকপক্ষ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; তা যথাযথ নয়।

লন্ডন উচ্চ আদালতের বিচারক রবার্ট জে আইনি সংস্থা লেইহ ডের উপস্থাপিত যুক্তির সঙ্গেও একমত পোষণ করেন। লেইহ ডে তাদের আর্জিতে উল্লেখ করে, বিক্রির পর জাহাজ কোথায় ভাঙ্গা হবে; তা নির্ধারণের ক্ষমতা মারান লিমিটেডের ছিল। কিন্তু শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বৈধ পন্থায় জাহাজটির ভাঙ্গা নিশ্চিত করলে, তারা এর জন্য কম দাম পেত। তাই মুনাফার লোভেই তারা জাহাজটিকে দক্ষিণ এশিয়ার অরক্ষিত শিল্পের হাতে তুলে দিয়েছে।

উচ্চ আদালতের রায়ের পর এখন ব্রিটিশ জাহাজ কোম্পানি মারানের বিরুদ্ধে সরাসরি অবহেলার দায়ে মামলা করতে আর কোনও বাধা থাকল না। সেই মামলায় জয়ী হলে হামিদা বেগম সর্বোচ্চ এক লাখ পাউন্ড ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন।

তবে এই মামলার গুরুত্ব অন্যখানে। এর ফলে বাংলাদেশের শতশত নিহত শ্রমিকের পরিবার এখন ইউরোপীয় মালিকানাধীন অন্যান্য পুরোনো জাহাজ বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ পাবেন। ফলে বাধ্য হয়েই শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাধ্য হতে হবে দেশের শিপইয়ার্ডগুলোর মালিকপক্ষকে।

আইনি প্রতিষ্ঠান লেইহ ডের একজন অংশীদার অলিভার হল্যান্ড বলেন, আদালতের রায়ে আমাদের মক্কেল হালিমা বেগম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। দুর্ঘটনায় তিনি শুধু তার স্বামীকে হারাননি বরং তার সামাজিক নিরাপত্তা এবং জীবিকাও হারিয়েছিলেন।

তিনি আরও বলেন, মারান লিমিটেড যদি হালিমা বেগমের স্বামীর মৃত্যুর মামলায় হেরে যায়; তবে এরপর থেকে যুক্তরাজ্যের অন্যান্য জাহাজ মালিকেরাও সতর্ক থাকবে। মুনাফার লোভে দক্ষিণ এশীয় শ্রমিকদের জীবন বিপন্ন করার আগেও তারা দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য হবে।