নিজস্ব প্রতিবেদক:
করোনা সংক্রমণ সুরক্ষায় দুটি থার্মাল স্ক্যানার ও মেটাল ডিটেক্টর কেনা হয় জুন মাসের শেষের দিকে। আর তার কয়েকগুণ বেশি বিল আদায়ের চেষ্টা চলছে এখন। কাইয়ুম নামে এক ঠিকাদার এসব স্ক্যানার ও মেটাল ডিটেক্টর সরবরাহ করে।

একইভাবে অক্সিজেন সিলিন্ডার, মাস্ক ও পিপিইও কেনা হয়েছে আগে। যার কয়েকগুণ বেশি বিল অনুমোদন করাতে গিয়ে বেরিয়ে আসে থলের বেড়াল। শুরু হয় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামজুড়ে হৈ-চৈ।

অভিযোগ উঠেছে, সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণ বিভাগের দুই কর্মকর্তা ঠিকাদারের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অধিক মূল্য দেখিয়ে কেনা হয়েছে এসব সামগ্রী। যার বেশিরভাগই ব্যবহার অনুপযোগী। তবে নিন্মমানের এসব সামগ্রীর দাম বেশি ধরায় বিল পেতে হিমশিম খাচ্ছেন ঠিকাদাররা।

কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, অসঙ্গতিপূর্ণ দর দেখানো সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয়ের বিল দেখে তা আটকে দিয়েছেন পূর্বাঞ্চলের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা। এখন ওই কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে বিল ছাড়িয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা কামরুন নাহার বলেন, আমি কোন ঠিকাদারকে চিনি না। শুধুমাত্র দামটা দেখি। এরমধ্যে যে কমিটিগুলোতে আমি আছি সেখানে দাম নিয়ে আপত্তি তুলেছি। যেখানে রেটগুলো আমার বেশি মনে হয়েছে সেখানে আমি ছাড় দিই নাই। কথা হচ্ছে একজনে আর কতটুকু করা যায়?

তিনি বলেন, অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম প্রতিটা ৫৮ হাজার টাকা দিয়েছিল। এখন তা ৪১ হাজারে এনেছি। মাস্কের দাম দিয়েছিল ৩৫০ টাকা থেকে কমিয়ে ৩২০ টাকায় এনেছি। তারপরও বলেছি. যারা ব্যবহার করবে তারা কি বলে দেখতে হবে। যে কারণে কিছু বিলে স্বাক্ষর করিনি।

সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ করা ঠিকাদার মো. কাইয়ুম বলেন, আমি কিছু সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ করেছি। তা নিয়ে আপত্তি দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা। এখন সেগুলো আমি ঠিক করে দিছি। এসব সামগ্রী দিয়ে কোন লাভ হয়নি।

তিনি জানান, নিরাপত্তা বিভাগ, বাণিজ্যিক বিভাগ ও পরিবহন বিভাগেই সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা সামগ্রী কেনা হয়েছে। লিমিটেড টেন্ডারিং ম্যাথড পদ্ধতিতে এসব সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয় করা হয়। প্রতিটি বিভাগ জরুরী প্রয়োজনে এসব সুরক্ষা সামগ্রী চেয়ে চাহিদা পত্র দিলে প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক ও পূর্বাঞ্চল সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক কার্যালয় এসব সামগ্রী ঠিকাদারদের মাধ্যমে সরবরাহ করেন। নির্দিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন সাপেক্ষে সুরক্ষা সামগ্রীর বিল প্রদান করার কথা নিজ নিজ বিভাগের। কিন্তু নিন্মমানের সামগ্রী দেয়া নিয়ে হৈ চৈ শুরু হলে নড়েচড়ে বসে রেল প্রশাসন।

রেলওয়ের কয়েকজন কর্মচারী বলেন, কর্মকর্তারা যেসব সুরক্ষা সামগ্রী পেয়েছেন তা কিছুটা মান থাকলেও কর্মচারীদের দেয়া হয়েছে নিন্মমানের সামগ্রী। সামগ্রীগুলো দেখলে যে কেউ বুঝবে পণ্যগুলোর মান কতটা খারাপ। কোথাও কোথাও কেএন৯৫ মাস্কের পরিবর্তে কাপড়ের মাস্ক দেয়া হয়েছে। বাজার থেকে নিন্মমানের স্যানিটাইজার কেনা হয়েছে।

চাহিদাপত্র অনুসারে কি পরিমাণ সুরক্ষা সামগ্রী কেনা হয়েছে জানতে চাইলে প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) রুহুল কাদের আজাদ ফোন রিসিভ করে বলেন, এখানে কোন সুরক্ষা সামগ্রী কেনা হয়নি। কোন থার্মাল স্ক্যানারও বসানো হয়নি।

তবে অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক আনোয়ারুল ইসলাম থার্মাল স্ক্যানার ও সূরক্ষা সামগ্রী কেনার কথা স্বীকার করে বলেন, টেন্ডার ছাড়া কেনাকাটা হয়নি। সবগুলোর টেন্ডার হয়েছে। টেন্ডার আগে না পরে হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এসবের বিষয়ে কিছুই জানি না। এসব বলার অথরাইজড আমি না। আপনি জিএমের সাথে কথা বলুন।

সূত্র জানায়, জুন মাসের শেষের দিকে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশ ও বাহির পথে ২টি থার্মাল স্ক্যানার বসানো হয়। যা নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডার আহবান করার কথা। কিন্তু রহস্যজনক কারনে কোন টেন্ডার বা কার্যাদেশ ছাড়াই কাইয়ুম নামের ওই ঠিকাদারের মাধ্যমে থার্মাল স্ক্যানারগুলো বসানো হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দুটি থার্মাল স্ক্যানার বসানোর জন্য সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা খরচ হতে পারে। কিন্তু অদৃশ্য কারনে ৫০ লাখ টাকা বিল পাশ করার চেষ্টা করেন রুহুল কাদের আজাদ ও অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক আনোয়ারুল ইসলাম। তাতে আপত্তি উঠায় প্রতিটি স্ক্যানার পূনরায় ১৩ লাখ টাকা কওে বিল দেখিয়ে অনুমোদন করার চেষ্টা করছেন।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সরদার সাহদাত আলী বলেন, সুরক্ষা সামগ্রী কেনায় দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করা হবে। এগুলো যাচাই বাছাই কমিটি আছে। তারাই মূল্য নির্ধারণ করবে।