নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাইড শেয়ারিং পাঠাও‘র সহপ্রতিষ্ঠাতা ফাহিম সালেহ নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটানে নিজের এপার্টমেন্টে খুন হয়েছেন। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার বিকেলে সালেহর খন্ড-বিখন্ড মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ। এ সময় তার মরদেহের পাশে একটি যান্ত্রিক করাতও পাওয়া যায়।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) নিউইয়র্ক ডেইলি নিউজ, নিউইয়র্ক পোস্টসহ স্থানীয় বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম এ খবর প্রকাশ করে। ফাহিমের দুর সম্পর্কের আত্নীয় আতাউর বাবুল বুধবার সকালে চট্টগ্রামের গণমাধ্যমকর্মীদের তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, ১৯৮৬ সালে জন্ম হওয়া ফাহিম সালেহ বেড়ে উঠে চট্টগ্রাম মহানগরে। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের হরিসপুরের সন্তান আইবিএমের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সালেহ আহমেদের ছেলে সে। তাঁর বাবাও বড় হয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগরে। তবে তার মা নোয়াখালীর মানুষ। ফাহিম ইনফরমেশন সিস্টেম নিয়ে পড়াশোনা করেছেন আমেরিকার বেন্টলি বিশ্ববিদ্যালয়ে। থাকতেন নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে প্রায় ২২ লাখ ডলারে কেনা ওই এপার্টমেন্টে। করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেও তিনি নিউইয়র্ক সিটির পাশে পোকি¯িপতে মা-বাবার সঙ্গে ছিলেন। কয়েকদিন আগে নিজের এপার্টমেন্টে ওঠেন।

রাইড শেয়ার অ্যাপ পাঠাও‘র সহপ্রতিষ্ঠাতা ফাহিম নাইজেরিয়া ও কলম্বিয়ায় এমন দুটি রাইড শেয়ারিং অ্যাপ কো¤পানির মালিক। ব্রিটেনের ডেইলি মেইল অনলাইনের খবরে ফাহিম সালেহকে একজন মিলিয়নিয়ার প্রযুক্তি বিষয়ক উদ্যোক্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা লিখেছে, নৃশংস এই হত্যাকান্ড স¤পর্কে প্রথমে জানতে পারে ফাহিম সালেহর বোন। মঙ্গলবার দিনভর ফাহিম সালেহর সাথে কোন যোগাযোগ না হওয়ায় বিকেল ৩:৩০ মিনিটে সপ্তম তলার ওই এপার্টমেন্টে দেখা করতে যান তিনি। সেখানে গিয়ে ফাহিম সালেহর খন্ড-বিখন্ড মরদেহ দেখতে পান।

পুলিশকে উদ্ধৃতি দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, এপার্টমেন্টের নিরাপত্তা ক্যামেরায় কালো স্যুট ও কালো মাস্ক পরা এক ব্যক্তির সাথে ফাহিম সালেহ একই লিফটে প্রবেশ করেন। লিফট এপার্টমেন্টের সামনে দাঁড়ালে দুজনেই সেখান থেকে বের হয়ে যান। এরপর ফাহিম সালেহ তার এপার্টমেন্টে প্রবেশ করেন। তখন সেই ব্যক্তি ফাহিম সালেহকে অনুসরণ করে। পুলিশ বলছে, এরপর দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।

নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, ফাহিম সালেহর জন্ম সৌদি আরবে। এরপর পরিবারের সাথে তিনি নিউইয়র্কে চলে যান। সালেহ পড়াশুনা করেন নিউইয়র্কে বেন্টলি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০১৪ সালে তিনি ঢাকায় এসে প্রযুক্তি-ভিত্তিক কিছু ব্যবসার উদ্যোগ নেন। কিন্তু সেগুলো ব্যর্থ হয়। এরমধ্যে সফল হয় পাঠাও উদ্যোগ। প্রতিষ্ঠার শুরুতে ফাহিম সালেহর সাথে আরো দুজন ছিলেন। পরবর্তীতে ফাহিম সালেহ তার কিছু শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে নিউইয়র্কে ফিরে যান। এরপর তিনি পাঠাও এর আদলে অন্যদেশে ব্যবসার চিন্তা করেন।

পাঠাও রাইড শেয়ারিং-এর জনসংযোগ কর্মকর্তা নাবিলা আক্তার জানান, বাংলাদেশে অ্যাপ-ভিত্তিক রাইড শেয়ারিং পাঠাও প্রতিষ্ঠার পরে থেকে ফাহিম সালেহ চেয়েছিলেন আফ্রিকা মহাদেশে ব্যবসা বিস্তার করতে। এর অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে নাইজেরিয়াতে গোকাডা নামে একটি রাইড শেয়ারিং সার্ভিস চালু করেন। তার সাথে সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আরো একজন ছিলেন।

ফাহিম সালেহর মালিকানাধীন গোকাডা সার্ভিস ডেলিভারিতে এক হাজার মোটর সাইকেল রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যেই সংকটে পড়েন তারা। কারণ নাইজেরিয়ার সরকার মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং নিষিদ্ধ করে। টেককাবাল নামে নাইজেরিয়ার একটি প্রযুক্তি বিষয়ক গণমাধ্যম রিপোর্ট করেছে যে, সংকটে পরার আগে এক বছরেই গোকাডা ৫৩ লাখ ডলার আয় করে। যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ হয়ে গেলে গোকাডা পার্সেল ডেলিভারি সার্ভিস চালু করে।

স্থানীয় পুলিশ ও গোয়েন্দাদের তথ্যমতে, ফাহিমের ঘরে পাওয়া মরদেহটির মাথা, হাত এবং পা শরীর থেকে কেটে বিচ্ছিন্ন করা হয়। মরদেহের পাশেই একটি ইলেকট্রিক করাত পাওয়া যায়। আর শরীরের কাটা অঙ্গগুলো মরদেহের পাশেই একটি প্লাস্টিক ব্যাগে পাওয়া যায়। পুলিশ এটিকে পরিকল্পিত ও খুবই কুৎসিত হত্যাকান্ড বলে আখ্যায়িত করেছে।

নিউইয়র্ক পুলিশের মুখপাত্র সার্জেন্ট কার্লোস নিভেস বলেন, পুলিশ ফাহিমের এপার্টমেন্টে গিয়ে তার খন্ডিত মরদেহ পাওয়ার পর এপার্টমেন্ট ভবনটিকে ঘিরে রাখে। পরে ঘটনাস্থল থেকে পরীক্ষার জন্য আঙ্গুলের ছাপ ও ফরেনসিক নমুনা সংগ্রহ করেন গোয়েন্দারা। এখন পর্যন্ত এই হত্যাকান্ডের কোনো মোটিভ আমাদের কাছে নেই।