বিশেষ সংবাদদাতা :
চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার ভুমিদস্যু এম এ রাজা কাসেম ওরফে কাসেম রাজা বেপরোয়া হয়ে উঠছে দিন দিন। নিজেকে শিল্পপতি পরিচয় দিয়ে আড়ালে চালাচ্ছেন ভুমিদখলের মতো ঘৃণ্যতম কাজ। সীতাকুন্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত উপকুলীয় রক্ষা বাঁধের বিশাল অংশ দখল করে তিনি গড়েছেন ডকইয়ার্ড।

শুধু তাই নয়, গড়ে তুলেছেন অবৈধ পর্যটন এলাকা। যেখানে পর্যটকদের কাছ থেকে প্রতি মাসে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি টাকা। সম্পূর্ণ অরক্ষিত এই পর্যটন এলাকায় প্রতিবছর ঘটছে প্রাণহানীর ঘটনা। এটি মূলত জেলা প্রশাসনের নৌ-ঘাট। যেটি মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে তিনি বছরের পর বছর নিজের নামে ইজারা নেন। এ সুবাধে বাঁধ ও আশপাশের শতশত একর জমি দখল করে পর্যটন ও ডকইয়ার্ড গড়ে তোলেন তিনি।ইয়ার্ডের কাজের কারনে বাঁধের উপর পানি উন্নয়ন বোর্ডের অর্ধকোটি টাকায় নির্মিত একটি কালবার্র্ড ভেঙে বাঁধের ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়েছে।

একইভাবে পর্যটন এলাকার নামে দোকানপাটসহ নানা স্থাপনা গড়ে তোলে বাঁধের আশপাশের জমির আকৃতি-প্রকৃতি পরিবর্তন করে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। শুধু বাঁশবাড়িয়া সমূদ্র উপকুলে নয় তিনি উপজেলার ফৌজদারহাটে উত্তর সলিমপুর মৌজার সমুদ্র উপকূলেও বিবিসি স্টিলের নামে শিপইয়ার্ড স্থাপনের জন্য কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ৭.১০ একর জমি লীজ নেন। কিন্তু তিনি সেখানে ১৯৫ একর সরকারি জমি দখল করে শিপইয়ার্ড নির্মাণের কাজ শুরু করেন।

আর এসব জমির পুরোটাই উপকুলীয় বনবিভাগের আওতায়। যেখান থেকে উপকুল রক্ষায় রোপন করা ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের হাজার হাজার কেওড়া গাছ গোড়াসহ কেটে ফেলেন রাতের আঁধারে। সেই সাথে প্রায় ৩০ফুট গভীর খাদ করে উপকুলীয় বাঁধ থেকে সমূদ্রের দিকে দু‘পাশে ভারী যানবাহন চলাচলের মতো ১২ ফুট চওড়া রাস্তা তৈরী করে।

এভাবে এসব জমি ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করায় উপকুলীয় বনবিভাগ উচ্চ আদালতে মামলা দায়ের করে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবি সমিতি-বেলা মামলার পক্ষে রিট করেন। রিটের শুনানির শুরুতে উচ্চ আদালতের বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশরাফুল কামালের যৌথবেঞ্চ ২০১৯ সালের ১৩ মে এ ভুমিতে যাবতীয় কার্যক্রমের উপর ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা জারী করেন এবং কেন এই লীজ অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানাতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের বরাবরে রুল জারী করেন।

কিন্তু ভুমিদস্যু রাজা কাসেম সীতাকুন্ড উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শিপইয়ার্ডের অফিসভবনহ নানা ঘেরা-বেড়া নির্মাণ কাজ করে। এসব কাজে আলাউদ্দিন, সালাউদ্দিন, মোহাম্মদ আলী নামে কতিপয় সন্ত্রাসীদের একটি বাহিনী ওই এলাকায় অবস্থান করে। এদের মধ্যে ১০-১২ জনের একটি নারী সন্ত্রাসী গ্রুপও রয়েছে।

এসব সন্ত্রাসী রাখার মূলত কারন হচ্ছে স্থানীয় ক্ষুব্দ লোকজনকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে তাদের কন্ঠরোধ করা। স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্দ হয়ে উঠার কারন হচ্ছে-উপকুলীয় বাঁধের ভেতরে থাকা গ্রামবাসীর জমি সরকারিভাবে অধিগ্রহণের নামে অর্ধশত পরিবারকে তাদের ভিটেমাটি, পুকুর ও ফসলি জমি থেকে উচ্ছেদ করা। এ নিয়ে গ্রামবাসীরা সীতাকুন্ড উপজেলা সদরে মানববন্ধন করলেও উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের নিরব ভুমিকা পালন করে।

এখানেই শেষ নয়, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ শেষ হওয়ার আগেই বছরের শেষের দিকে শিপইয়ার্ড নির্মাণের লীজ বাতিলের রায় দেন বিচারিক আদালত। কিন্তু এই নির্দেশ অমান্য করে ভুমিদস্যু রাজা কাসেম ১৯৫ একর জমির এক বিন্দুও দখল ছাড়েনি এখনো। বরং জমির একটি অংশে শিপইয়ার্ড নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

সরেজমিন পরিদের্শনে দেখা যায়, লীজ বাতিল হওয়া জমিতে উপকুলীয় বাঁেধর পাশে জাহাজ কাটার জন্য তিনি দুটি হুইসেল স্থাপন করেছেন। জাহাজ কাটা কার্যক্রম ও জাহাজের মালামাল পরিবহণের জন্য তিনি জমিতে সড়ক ও পাকা স্থাপনা নির্মাণ করছেন।

এছাড়া সীতাকুন্ড উপজেলার কদমরসুল এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে সরকারি বিপুল জমি দখল করে বাণিজ্যিক ভবন, দোকানপাট ও খামার গড়ে তোলেন। এ নিয়ে সওজ বিভাগ আপত্তি করলে জমির উপর রাজা-কাসেম প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পরবর্র্তিতে রাজা-কাসেম উচ্চ বিদ্যালয় গড়ে তোলেন। যেগুলো উপজেলা প্রশাসনের যোগসাজশে সরকারিকরণ হয়ে যায় দ্রুত। সড়কের জমি থেকে উচ্ছেদ তো দুরের কথা এ বিদ্যালয়ে এখন সরকারি ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে বহুতল ভবন।

এখানে থেমে নেই ভুমিদস্যু রাজা কাসেম। বাঁশবাড়িয়া এলাকার ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কের পূর্ব পাশে পাহাড়ের পাদদেশে খাস জমি দখল করে। যা পরবর্তিতে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে নিজের নামে ভুয়া খতিয়ান সৃজন করে এসব জমি একের পর এক বিক্রয় করে তিনি এখন শত কোটি টাকার মালিক। কোন কোন জমির ভুয়া খতিয়ান দিয়ে ঋণের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।

চট্টগ্রাম মহানগরীর দুই নম্বর গেইট পাশ্ববর্তি আবাসিক এলাকায় কোটি টাকায় জমি কিনে গড়ে তোলেন চার তলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল বাসভবন। চলাফেরা করেন কোটি টাকা মূল্যের শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে। নিজেকে পরিচয় দেন শিল্পপতি হিসেবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা মো. গোলাম মাওলা বলেন, সীতাকুন্ড উপজেলার উত্তর ছলিমপুর মৌজায় উপকুলীয় বন বিভাগের জায়গা কারসাজির মাধ্যমে সমুদ্র সিকস্তি বালুচর দেখিয়ে ১নং খাস খতিয়ান মুলে ৭.১০ একর জমি একসনা লীজ নেন এম এ কাসেম রাজা ওরফে রাজা কাসেম। লীজ পেয়ে তিনি বনের ১৯৫ একর জমি লোহার তারের ঘেরা-বেড়া দিয়ে দখল করে।

এছাড়া জমি অধিগ্রহণের নামে উপকুলীয় বাঁধের উত্তর পাশে জনসাধারণের ভিটে নাল জমি ও পুকুর জবর দখল করে। সেখানে মাটি ভরাট করে পাকা ভবন ও নানা স্থাপনা গড়ে তুলেন। তার সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে এলাকার সাধারণ মানুষ মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না।

তবে এলাকার লোকজন সীতাকুন্ড সংসদীয় আসনের এমপি আলহাজ দিদারুল আলমের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করলে সংশি¬ষ্ট দপ্তরগুলোতে ডিও লেটার দিয়ে লিজ বাতিলের অনুরোধ জানান তিনি। একই দাবিতে সীতাকুন্ড ভাটিয়ারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন, মেম্বার মাইন উদ্দিনসহ এলাকাবাসী দফায় দফায় সংবাদ সম্মেলন করেন। কিন্তু কিছুতেই রোধ করা যায়নি অবৈধ কর্মকান্ড। বর্তমানে সবগুলো গাছ কেটে ফেলার হুমকি দিচ্ছে রাজা কাসেম।

পানি উন্নয়নের বোর্ডের চট্টগ্রাম অঞ্চলিক কার্যালয়ের তত্ত্ববধায়ক প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিকী বলেন, বাঁশবাড়িয়া সমূদ্র উপকুলের বাঁধ দখল করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলার বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। পরবর্তি নির্দেশনা পেলে সে মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো, ইলিয়াছ হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, ঘুষের বিনিময়ে সব কাজ আদায় করতে পারেন রাজা কাসেম। যেভাবে সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে বাঁশবাড়িয়া থেকে ফৌজদারহাটসহ বিভিন্ন স্থানে সরকারি জমি লীজ নিয়েছেন। এমনকি ভুয়া খতিয়ান সৃজনেও পারদর্শী এই ভুমিদস্যু।

এ বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে এম এ কাসেম রাজা উত্তেজিত কন্ঠে গালমন্দ শুরু করেন। তিনি বলেন, আমি সীতাকুন্ডের রাজা। যা ইচ্ছা লেখ। প্রশাসন, আদালত সবাই আমার পক্ষে। কেউ আমার কিছুই করতে পারবে না।

(পরবর্তি প্রতিবেদন-‘ নারী পাচারে সক্রিয় রাজা কাসেম’, চোখ রাখুন শুধুমাত্র শুভ চট্টগ্রাম নিউজ পোর্টালে)