এনামুল হক নাবিদ, আনোয়ারা প্রতিনিধি : চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার কৈনপুরা উচ্চ বিদ্যালয়ের আলোচিত সেই প্রধান শিক্ষক সুধাংশু চন্দ্র দেবনাথের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

এতদিন ভয়ে সেই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস না করেনি। তার গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার কারণে জেএসসি পরীক্ষার রেজিট্রেশন করতে না পেরে গত ২৯ জুন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র দুর্জয় দাশ আত্মহত্যা করে। যা টনক নড়েছে ভুক্তভোগীদের।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দুর্জয় দাশের মত প্রধান শিক্ষকের অনিয়মের বলির পাঁঠা হয়ে এবার জেএসসি পরীক্ষার রেজিট্রেশন করতে পারেনি আরো ৮ শিক্ষার্থী। রেজিট্রেশন না করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিদ্যালয়ের করনিক অনুপম রায় ও অষ্টম শ্রেণীর দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা।

তাদের মতে, প্রতিবছর এভাবে অনেক শিক্ষার্থী প্রত্যয়নপত্রের জন্য জন্মনিবন্ধন সংশোধন করতে না পেরে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার রেজিট্রেশন করতে পারে না। ফলে তারা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা থেকে বাদ পড়ে। এ স্কুলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা যেন প্রধান শিক্ষকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আর এ বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি নীরব ভূমিকা পালন করছে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।

ভুক্তভোগী অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা জানায়, প্রধান শিক্ষকের কাছে আমরা জিম্মি। জন্মনিবন্ধন সংশোধন করতে না পারায় এবার আমাদের ছেলেমেয়েরা রেজিট্রেশন করতে পারেনি। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার রেজিট্রেশন করতে গেলে প্রধান শিক্ষক বলে জন্মনিবন্ধন সংশোধন করে না আনলে রেজিট্রেশন করা যাবে না। জন্মনিবন্ধন সংশোধন করতে তথ্যসেবা কেন্দ্রে গেলে সেখানে স্কুল থেকে প্রত্যয়নপত্র আনতে বলে। প্রত্যয়নপত্রের জন্য স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে গেলে তিনি প্রত্যয়নপত্র দেন না। এ দায়ভার তিনি নিতে পারবেনা বলে পরিষ্কার জানিয়ে দেন।। প্রতি বছর অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন দ্বারে দ্বারে ঘুরেও বয়স সংশোধনী প্রত্যয়নপত্র না পেয়ে রেজিট্রেশন করতে না পারার কারণে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেনা। এসব বিষয়ে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের অবগত করলেও তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি।

তারা জানায়, দুর্জয় দাশের আত্মহত্যার ঘটনায় দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে প্রতিবছর এভাবে রেজিট্রেশন করতে না পেরে আরও অনেক শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে অঘটন ঘটাতে পারে। তখন এর দায়ভার কে নিবে? এজন্য প্রধান শিক্ষক সুধাংশু চন্দ্র দেবনাথকে অপসারণের দাবি জানান ভুক্তভোগীরা।

এছাড়াও প্রধান শিক্ষক সুধাংশু চন্দ্র দেবনাথের বিরুদ্ধে স্কুলের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির মধ্যে রয়েছে ভর্তি বাণিজ্য, জেএসসি ও এসএসসির অতিরিক্ত রেজিস্ট্রেশন ফি আদায়, আর্থিক সুবিধা নিয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ভর্তি, শিক্ষার্থীদের দিয়ে নির্দিষ্ট লাইব্রেরী থেকে জোরপূর্বক গাইড বই কিনতে বাধ্য করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা এসব অভিযোগ করেছেন। শুধু তাই নয়, ওই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে দুর্ব্যবহার করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। প্রধান শিক্ষকের ব্যাংক এক্যাউন্ট জব্দের দাবিও জানান তারা।

স্কুলের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগও করেছিলেন বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির বর্তমান সদস্য ডাক্তার নিতাই কর। অভিযোগ থেকে জানা যায়, কৈনপুরা উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০২০ সালের নির্বাচনী পরীক্ষায় ৯৬ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। তন্মধ্যে ২৪ জন কৃতকার্য এবং ৭২ জন জন অকৃতকার্য হয়। অকৃতকার্য ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে ৬৩০০ টাকা করে আদায় করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়। অতিরিক্ত টাকা আদায়ের ব্যাপারে ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকদের উল্লেখিত নিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপারে কাউকে না জানানোর জন্য ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন অন্যথায় পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

ভুক্তভোগী মহরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা মোঃ মহিউদ্দিন জানান, গতবছর আমার এলাকার ছোট বোনের জন্মনিবন্ধন সংশোধন করতে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে প্রত্যয়নপত্রের জন্য গেলে তিনি প্রত্যয়নপত্র দেয়নি। বিষয়টি স্কুল কমিটির সভাপতিকে জানালে তিনি সমাধানের আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে কোন সুরাহা হয়নি। পরে প্রধান শিক্ষক শিক্ষা বোর্ডের অজুহাত দেখিয়ে রেজিষ্ট্রেশন করতে পারবে না বলে আমাকে সাফ জানিয়ে দেয়।

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির বর্তমান সদস্য ডাক্তার নিতাই কর জানান, স্কুলের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আসি সবসময় প্রতিবাদ করেছি এবং প্রতিকারের দাবি জানিয়েছি। এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকেও অনেকবার অভিযোগ করেছি। তিনি সরজমিনে এসে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন।

এ ব্যাপারে জানতে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি রঘুপতি সেনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্ঠা করা হলে মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ ফেরদৌস হোসেন বলেন, স্কুল থেকে শিক্ষার্থীদেরকে প্রত্যায়নপত্র দিতে কোন সমস্যা নেই। বিষয়টি নিয়ে আমরা তদন্ত করে দেখব।