দিদার আলম :
চট্টগ্রামে চরম অবহেলায় সময় কাটাচ্ছে হোম আইসোলেশনে থাকা করোনা আক্রান্ত রোগীরা। অনেকের অভিযোগ তাদের নেই কোন চিকিৎসা, নেই তদারকি। সপ্তাহ-দশদিন পেরিয়ে গেলেও হচ্ছে না দ্বিতীয় নমুনা টেস্ট। ফোন করেও মিলছে না ডাক্তারদেও সাড়া।

কেউ কেউ বলছেন-ফোন রিসিভ করলেও শুধুমাত্র কয়েকটি ওষুধের নাম বলেই শেষ। ফলে চরম অস্বস্তি ও মৃত্যু শঙ্কা নিয়ে দিনযাপন করছেন তারা। চিকিৎসা না পেয়ে অনেকেই লেবু ও মসলার গরমপানির ভাপ, গারগেল করে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সবমিলয়ে অনিশ্চিত জীবন যাপন করছেন আক্রান্তরা।

নগরীর খুলশী এলাকার বাসন্দা কাউছার আলম বলেন, গত ২২ মে তার বাবা শ্বাসকষ্টে মারা যান। এরপর ২৮ মে তিনি ও তার মা করোনা পজিটিভ শনাক্ত হন। যা শুধুমাত্র ফোন করে হোম আইসোলেশনে থাকতে বলা হয়। কিন্তু কোন চিকিৎসক বা নার্স তদারকি করতে আসেনি। এই বিষয়ে আমাদের কোনো ধারণাও নেই। তাই বিষয়টা নিয়ে খুব মানসিক চাপে আছি। ফোন করলেও ডাক্তারদের সাড়া মেলেনি। পরে ৩৩৩ নম্বরে বেশ কয়েকবার কল করে পেলেও সেখানে উপসর্গ জেনে কিছু ওষুধের নাম দেন।

কাউছার আলম বলেন, জ্বর ছাড়া আমাদের শরীরে কোন উপসর্গ নেই। তবুও চিকিৎসা না পেয়ে চরম হতাশা ও মৃত্যু শঙ্কা নিয়ে দিনাতিপাত করছি। বেচে থাকার জন্য নিরুপায় হয়ে লেবু-মসলার গরম পানির ভাপ ও গারগেল করে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি। এ অবস্থায় দশদিন পার হয়ে গেলেও আমাদের দ্বিতীয় নমুনা টেস্টের কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

নগরীর বায়েজীদ এলাকার বাসিন্দা প্রবাসী মো. নাছের জানান, গত ২৯ মে তার স্ত্রী করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মৃত্যুর পর তার রিপোর্ট আসে করোনা পজেটিভ। এরপর পরিবারের চার সদস্যের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। সবার করোনা পজেটিভ রিপোর্ট আসে। এরপর একটা নম্বর থেকে কল করে কিছু ওষুধ খেতে এবং হোম আইসোলেশনে থাকতে বলা হয়। পরে ওই নম্বরে কল করলেও কেউ রিসিভ করেনি। কোন উপায় না দেখে গরমপানির ভাপ নিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে এই বুঝি মারা যাব, এমন আতঙ্ক নিয়ে সময় কাটাচ্ছি।

শুধু কাউছার আলম ও প্রবাসী নাছের নয়, গত কয়েকদিনে হোম আইসোলেশনে থাকা অন্তত ১১-১২ জন করোনা আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা না পাওয়ার তথ্য জানান। করোনা আপডেট চিটাগং নামের একটি ফেসবুক গ্রুপের অ্যাডমিন তানভীর রনি বলেন, হোম আইসোলশনে চিকিৎসা না পাওয়া এমন অনেক রোগী গ্রুপের পেইজে যোগাযোগ করে। তারা আমাদের সাহায্য চান। অনেকে কী করবে তা জানার জন্য চিকিৎসকদের সাথে একটু কানেক্ট করে দিতে বলেন।

তিনি বলেন, প্রথম দিকে ডাক্তাররা খুব রেসপন্স করতো। কিন্তু এখন যে পরিমাণে ফোন যাচ্ছে, উনারাও সাড়া দিতে পারছেন না। প্রতিদিন অন্তত ৩০-৪০ জন এই বিষয়ে সাহায্য চান। তবে এ বিষয়ে ৫-৭ জন ডাক্তারের একটা টেলিমেডিসিন টিম গঠন করো যদি প্রতিদিন পজিটিভ হওয়া রোগীদের সেবা, পরামর্শ ও একটি গাইডলাইন দিতেন, তাহলে রোগীরা অন্তত স্বস্তি পেত।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক কর্মকর্তা ডা. জামাল মোস্তফা এ বিষয়ে বলেন, আমাদের হাসপাতালে তিনজনের দায়িত্বে একটা হটলাইন সেবা চালু রয়েছে। এরমধ্যে অসীম কুমার নাথ স্যার নিজেই স্ট্রোক করে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আমরা দুজন এটা চালিয়ে নিচ্ছি। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে অনেক। হাসপাতালে রোগীদেরও সেবা দিতে হচ্ছে। ফলে অনেককেই রেসপন্স করতে পারি না। এখন অনেককে আমরা ৩৩৩ জরুরি সেবা ও ১৬২৬৩ নম্বরে কল করে পরামর্শ নিতে বলছি।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বী বলেন, যে নম্বর থেকে রোগীকে আমরা কল করবো ওই ডাক্তারের সাথে রোগী যোগাযোগ রাখবেন। আমরা এটা চেষ্টা করে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে ব্যত্যয় ঘটছে। দেখা যায় অনেকের নাম্বারে পাওয়া যায় না।

হোম আইসোলেশনে থাকা রোগীদের দ্বিতীয় টেস্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন বলেন, এ ব্যাপারে সরকারের গাইডলাইন হচ্ছে পরপর তিন দিন যদি উপসর্গ না থাকে তাহলে সে সুস্থ। কিন্তু ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে হোম আইসোলেশনে থাকাদের দ্বিতীয় টেস্ট জরুরি না। শুধুমাত্র হাসপাতালে যারা আছেন তাদের ছাড়ার আগে আরেকটা স্যা¤পল আমরা টেস্ট করাচ্ছি।

সিভিল সার্জনের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত করোনা আক্রন্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৯৬৫ জন। এরমধ্যে হাসপাতালে চিকিৎিসাধীন আছেন মাত্র ৩৩২ জন। মারা গেছেন ৯৪ জন। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফিরেছেন ২৬৭ জন। হোম আইসোলেশনে সুস্থ হয়েছেন ৭৫৫ জন। বাকি ২ হাজার ৫১৭ জন এখনও হোম আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মোস্তফা খালেদ বলেন, নগরীর রোগীদের ক্ষেত্রে জেনারেল হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে হাসপাতাল থেকে কল করে রোগীদের আইসোলেশনে থাকতে বলা হয়। উপজেলাগুলোতেও আলাদাভাবে এই কাজটি করার লোক আছে। যারা ফোন দিচ্ছেন আইসোলেশনের সময়ে চিকিৎসার তদারকিও করার দায়িত্ব তাদেরই। বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা হবে।