মো. বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী থেকে:
গাছে ঝুঁলছে থোকা থোকা লিচু। দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। চট্টগ্রামের গন্ডি পেরিয়ে সারাদেশে বাঁশখালীর কালিপুরের লিচুর কদর রয়েছে। স্বাদে-গুণে ও পুষ্টিতে অতুলনীয় এই স্থানীয় জাতের লিচুর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। ব্রিটিশ আমল থেকেই বাঁশখালীর উপজেলার কালীপুরে জমিদার বংশের লোকজন বোম্বাই, কোলকাতা, চায়না-থ্রি জাতের লিচু চারা কলম সংগ্রহ করে বাগান সৃজন করে আসছেন। পরে তা জলদি, পুকুরিয়া, সাধনপুর, চাম্বল, নাপোড়ায় বিস্তৃতি লাভ করে।
ভালো ফলন হওয়ায় একেকটি বাগান এক থেকে দেড় লাখ টাকার লিচু বিক্রি হচ্ছে। বাঁশখালীর তিন-চারটি এলাকায় লিচুর পাইকারী বাজার বসে। পাইকারি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে যায় বাঁশখালীর এ লিচু। এ অঞ্চলের লিচুর কলম চারার চাহিদাও ব্যাপক। কালিপুর, বৈলছড়িসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে কলম চারার ব্যবসা ভালো জমেছে। দূর-দূরান্ত থেকে লিচু চাষীরা কলম চারা কিনতে আসে কালীপুরে।
এদিকে, লিচুর উৎপাদনের শুরুতেই বৃষ্টি কম হওয়ায় চাষীরা অনেকটা হতাশ ছিলেন। বাজারে আগাম লিচু বাগান ও লিচুর আকার ভেদে প্রতি শত লিচু বিক্রি হচ্ছে ৩-৪শ’ টাকায়। স্থানীয় বাজারে প্রথম দিকে দাম বেশি থাকলেও ধীরে ধীরে দেড়শ থেকে দুই শত টাকায় নেমে আসবে।
সবেমাত্র রসালো হয়ে উঠছে এই অঞ্চলের লিচু। চলতি বছর লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। চলতি মৌসুমে শুধুমাত্র বাঁশখালীতেই ৯০-১০০ কোটি টাকার লিচু বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে উপজেলা কৃষি অফিস। চলতি বছর লিচুর বাম্পার ফলন হওয়ার সাথে পবিত্র রমজান মাস থাকায় লিচু বাগানীরা অধিক লাভের আশা দেখলেও; করোনা সংকটে লিচু বিক্রি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। দূর-দূরান্ত থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা লকডাউনের কারণে বাঁশখালীতে লিচু ক্রয়ের জন্য আসতে না পারলে বাজার জমবে না; এমনটি বলেছেন বাগানিরা।
বাঁশখালী কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কালিপুরের ৩০০ হেক্টর সহ পুরো উপজেলায় মোট ৬০০ হেক্টর বাগানে স্থানীয় জাতের লিচু উৎপন্ন হয়। বাঁশখালীর পাহাড়ী এলাকায় উন্নতমানের জাত হিসেবে পরিচিত বোম্বাই, বেদানা, চায়না-৩, বারি-১, বারি-২ ও বারি-৩ জাতের লিচু উৎপাদিত হয়। এসব লিচুর মোট উৎপাদনও বেশি, আবার আকারেও বড়। রঙও মনলোভা। এবার লিচুর ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে।
বাঁশখালীতে প্রতি বছরই লিচুর ফলন বৃদ্ধি পাচ্ছে ; এমনটি বললেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক। তিনি জানান, ২০১৫ সালে ৫০ কোটি, ২০১৬ সালে ৬০ কোটি, ২০১৭ সালে ৭০ কোটি, ২০১৮ সালে ৮০ কোটি, ২০১৯ সালে ৯০ কোটি টাকার লিচু উৎপাদিত হয়েছে বাঁশখালীতে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বাঁশখালীর পুকুরিয়া, বৈলছড়ি, কালিপুর, সাধনপুর পাহাড়ী এলাকা ও প্রধান সড়কের রাস্তার ধারে থোঁকায় থোঁকায় ঝুঁলছে লিচু। লিচু বাগানীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছর লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু তারা করোনা সংকটে লিচু বাজারজাতকরণ ও বিক্রি নিয়ে চিন্তিত। লিচুর ফলন দেখে খুশি হলেও বাগান মালিকদের মুখে হাসি নেই। করোনার কারণে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার বড় বড় ব্যবসায়ীরা এখনো লিচু কেনার আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
কালিপুরের লিচু বাগানি নুর মোহাম্মদ কিবরিয়া বলেন বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও লিচু বাগান করেছি। ঝড় না হওয়ায় ফলন ভালো। কিন্তু বাইরে থেকে কেউ লিচু কিনতে আসছে না। সে কারনে কি যে হবে বুঝতে পারছিনা।
বাঁশখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক বলেন, বাঁশখালীতে প্রায় সাড়ে ৬শ’ হেক্টর জায়গা জুড়ে লিচু চাষ হয়ে থাকে। স্থানীয় উন্নত জাতের এই লিচু উৎপাদনে চাষীরা বেশ গুরুত্ব সহকারে উৎপাদন কাজে শ্রম ব্যয় করায় বাণিজ্যিক ও ঘরোয়াভাবে উৎপাদিত এই লিচুর কদর দেশ জুড়েই। ভালো ফলন পেতে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, বাঁশখালীর লিচু চট্টগ্রামের চাহিদা মিটিয়ে সারাদেশে সরবরাহ হচ্ছে।