নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রামে করোনায় মৃত প্রথম ব্যক্তি সিরাজুল ইসলামের বাড়ি সাতকানিয়া উপজেলার ইছামতি গ্রামে। এর আগে প্রথম করোনা শনাক্ত ব্যক্তিও সাতকানিয়া উপজেলার বাসিন্দা। যিনি ওমরা ফেরত মেয়ের সংস্পর্শে এসে করোনায় আক্রান্ত হন। এরপর তার ছেলের নমুনা পরীক্ষায় করোনা পজেটিভ আসে।

মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিসেস (বিআইটিআইডি)-এ নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হওয়া ১২ জনের মধ্যেও ৫ জন সাতকানিয়া উপজেলার বাসিন্দা।

এর আগে ১২ এপ্রিল সাতকানিয়া পৌর এলাকার এক শিক্ষার্থী ও এক যুবক করোনা আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়। সবমিলয়ে চট্টগ্রামের বিআইটিআইডিতে করোনা শনাক্ত ৩০ ব্যক্তির মধ্যে ১১ জনই সাতকানিয়া উপজেলার বাসিন্দা। এছাড়া বোয়ালখালী উপজেলার ২ জন, সীতাকুন্ড উপজেলার ৩ জন, পটিয়া উপজেলার ২ জন, লক্ষীপুর জেলার ২ জন, নোয়াখালী সোনাইমুড়ির একজন এবং বাকী ৯ জন চট্টগ্রাম মহানগরীর বাসিন্দা।

করোনা আক্রান্তের এই পরিসংখ্যান চট্টগ্রামের অন্য এলাকায় জ্যামিতিক হারে বাড়ার নির্দেশ দিলেও সাতকানিয়া উপজেলায় তা গাণিতিক হারে লাফিয়ে বাড়ার তথ্য দিচ্ছে। যা থেকে অনুমেয় চীনের উহানের মতো চট্টগ্রামেও করোনার আতুড় ঘর হতে চলেছে সাতকানিয়া উপজেলা।

এ তথ্যের সাথে দ্বিমত নেই চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের। তাদের মতে, সাতকানিয়ায় করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার মূলে হচ্ছে ব্যবসা কানেকশন। এ এলাকার অধিকাংশ মানুষ ব্যবসায়ী। যাদের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসহ সিঙ্গাপুর, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সর্বোপরি দেশের রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের সাথে যাতায়াত বেশি। ফলে এ এলাকায় করোনা ছড়িয়ে পড়ে সর্বপ্রথম।

তবে করোনার সংক্রমণ রোধে আজ বুধবার থেকে পুরো সাতকানিয়া উপজেলা লকডাউন করে দেওয়া হয়েছে। এ উপজেলার ৩ হাজার ৭১২ জন ব্যক্তিকে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া বোয়ালখালী উপজেলার ২০ বাড়ি, নগরীর সগরিকাসহ করোনা শনাক্ত ব্যক্তির আশপাশ লকডাউন করা হয়েছে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন এ তথ্য দেন।

তিনি জানান, করোনা ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় সাতকানিয়া উপজেলার বাসিন্দাদের ব্যাপকহারে নমুনা পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে করোনা আক্রান্তদের সং¯পর্শে আসায় সাতাকনিয়া ইউএনও, স্বাস্থ্য কর্মকর্তাসহ ৮ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবদুল মজিদ ওসামনীকে ইতোমধ্যে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ও সাতকানিয়া উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সাতকানিয়ার ইছামতি গ্রামে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তি চট্টগ্রাম নগরের ফকিরহাটে ব্যবসা করতেন। ব্যবসার সুবাধে তিনি রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে যাতায়াত করতেন। তবে ১৭ দিন আগে শারীরিক অসুস্থতার কথা জানিয়ে তিনি নিজ বাড়ি সাতকানিয়ার ইছামতি গ্রামে চলে যান। পরে সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ১ এপ্রিল রাতে উপজেলার কেরাণীহাটে বেসরকারি আশ শেফা হাসপাতালে ভর্তি হন।

২ এপ্রিল করোনা সন্দেহে রোগীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) রেফার করেন চিকিৎসক। পরে চমেকে আনার পথেই ওইদিনই রোগীর মৃত্যু হয়। পরে শনিবার নমুনা পরীক্ষায় তার রিপোর্ট করোনা পজিটিভ আসে।

এ ঘটনায় তার মরদেহ যারা গোসল করিয়েছেন, কবর দিয়েছেন, তাকে ধরে কান্নাকাটি করেছেন, দাফন কাজে অংশ নিয়েছেন, জানাজার ইমাম ও জানাজায় উপস্থিত লোকজন সবার তালিকা করা হয়। তালিকায় পশ্চিম ঢেমশা ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ৩৯০টি পরিবারের তিন হাজার ৭১২ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইন মেনে চলার কথা বলা হয়। কিন্তু চারদিনের ব্যবধানেই সেখানে আরও পাঁচ করোনা রোগী শনাক্ত হয়।

চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া তথ্যমতে, গত ২৫ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ১৪ দিনে বিআইটিআইডি হাসপাতালে নমুনা পরীক্ষায় করোনা রোগী শনাক্ত হয় ১৫ জন। আর ৮ এপ্রিল থেকে ১৪ এপ্রিল ৭ দিনে করোনা রোগী শনাক্ত হয় ১২ জন। এদের মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীর সাগরিকায় এক নারী, পটিয়ায় এক শিশু এবং সাতকানিয়ায় সিরাজুল ইসলামের মৃত্যু ঘটে।