বিশেষ প্রতিবেদক :
করোনায় থেমে গেছে দেশের অর্থনীতি। থেমে গেছে বিশ্ব। প্রতি মুহুর্তে থমকে যাচ্ছে নি:শ্বাস আর বিশ্বাস। এরমাঝেও দমছে না ইয়াবা পাচারকারীরা। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৪ মার্চ থেকে দেশে চলমান অঘোষিত লকডাউনের মধ্যেও একের পর এক ঘটছে ইয়াবা পাচারের ঘটনা।

এরমধ্যে কয়েকটি ঘটনা মানুষের মনকে নাড়া দিয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে গত ৫ এপ্রিল রবিবার দুপুরে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড পৌর সদরের শেখ পাড়া এলাকায় দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির শরীরে ৩ হাজার পিস ইয়াবা পাওয়ার ঘটনা। আহত ওই ব্যক্তির নাম আনু মিয়া (৪৫)। তার বাড়ী নারায়নগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ এলাকায়।

স্থানীয়রা জানান, করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিত করতে সরকার আগামি ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। ১১ এপ্রিল পর্যন্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। আর এরমধ্যেও চলছে ইয়াবা পাচার।

সূত্র জানায়, আনু মিয়া রবিবার দুপুরে মোটর সাইকেলে যাওয়ার সময় সীতাকুন্ড পৌরসভার শেখ পাড়া এলাকায় অটোরিক্সার সংঘর্ষ হয়। এ সময় অটোরিক্সার যাত্রী জসিম উদ্দিন (৪৩) ও তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন তাদের উদ্ধার করে সীতাকুন্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

এ সময় চিকিৎসা দিতে গিয়ে আনু মিয়ার শরীরে বিশেষভাবে রক্ষিত ১৫টি ইয়াবার প্যাকেটে তিন হাজার পিস উদ্ধার করেন চিকিৎসকরা। খবর পেয়ে কুমিরা হাইওয়ে পুলিশ ইয়াবাগুলো উদ্ধার কওে বলে জানায় কুমিরা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সাইদুল ইসলাম।

এর আগে গত ২ এপিল ইয়াবা নিয়ে বগুড়া যাওয়ার পথে চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্দর থানার নিমতলা বিশ্বরোড এলাকা থেকে বাসেদ মিয়া(২৯) ও সাফায়েত(২৭) নামে দুই মাদক পাচারকারীকে আটক করে র‌্যাব-৭ এর সদস্যরা। এসময় তাদের থেকে ৬ হাজার ৭৪০ পিস ইয়াবা, নগদ টাকা ও মাদক বহনের ট্রাক জব্দ করা হয়। তাদের গ্রামের বাড়ি বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ থানায় বলে জানান র‌্যাব-৭ এর সহকারী পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. মাহমুদুল হাসান মামুন।

এর আগে ৩০ মার্চ সোমবার কোতোয়ালি থানার দেওয়ানবাজার এলাকা থেকে আজিজ (৩০) ও শফিউল (৪৫) নামে দুই মাদকব্যবসায়ীকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৩০০ পিস ইয়াবা পাওয়া যায় বলে জানান কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহসিন। তিনি বলেন, ইয়াবার হোম সার্ভিস দিতে এসে তারা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।

এর আগে ২৮ মার্চ শনিবার ভোরে কক্সবাজারের টেকনাফে বিজিবি ও পুলিশের সঙ্গে পৃথক বন্দুকযুদ্ধে ৪ মাদকপাচারকারী নিহতের ঘটনা ঘটে বলে জানায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-২ ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল ফয়সল হাসান খান।

তিনি জানান, হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা এলাকা থেকে মাদক পাচারের খবর পেয়ে শনিবার ভোররাতে অবস্থান নেয় বিজিবির টহল দল। এসময় নাফ নদী অতিক্রম করে ৪-৫ জন লোক মাদকের চালান নিয়ে আসার সময় বিজিবি টহল দল ধাওয়া করে। মাদক কারবারিরা বিজিবি সদস্যদের উপর গুলি চালালে বিজিবিও আত্নরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়।

পরে ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ ৩ জনকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার ইয়াবা ও ২টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এসময় বিজিবির ৩ সদস্য আহত হয়।

একইদিন শনিবার ভোরে টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকায়ও পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মুছা আকবর (৩৬) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়। পুলিশের দাবি, নিহত ব্যক্তি মাদক পাচারকারী। ঘটনাস্থল থেকে ৬ হাজার ইয়াবা ও একটি দেশীয় তৈরি বন্দুকও উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত মুছা আকবর হোয়াইক্যং তুলাতলী এলাকার আবুল বশরের ছেলে। ২ নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সভাপতি। তার বিরুদ্ধে থানায় বেশ কয়েকটি মাদকের মামলা রয়েছে বলে জানান টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ।

এর আগে ২৪ মার্চ মঙ্গলবার রাতে নগরীর আগ্রাবাদ সাউথল্যান্ড সেন্টারের পাশ থেকে আবু সৈয়দ (৩১) ও মো. আরমান (১৮) নামে ইয়াবাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ (বন্দর)। এসময় তাদের থেকে ২ হাজার ২০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয় বলে জানান নগর গোয়েন্দা (উত্তর) পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন।

এভাবে একের পর এক মাদক পাচারের ঘটনা শুধু মানুষের মনকে নাড়া দেয়নি। নাড়া দিয়েছে পুলিশ প্রশাসনকেও। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, করোনায় পুরো দেশ যখন থমকে গেছে, বিশ্বে প্রতিদিনি হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে, সেখানেও দমছে না ইয়াবা পাচারকারীরা।

বরং পুলিশ প্রশাসন যখন করোনা থেকে বাচাতে দেশের মানুষের সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিতকরণের কাজে ব্যস্ত, তখন সে সুযোগে পাচারকারীরা আরও জোরেশোরে ইয়াবা পাচার শুরু করেছে। তাদের মৃত্যুরও ভয় নেই। এমন মত প্রকাশ করেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আমেনা বেগম।

তিনি বলেন, করোনায় লকডাউনের মধ্যেও ইয়াবা পাচারের কয়েকটি ঘটনায় পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিতকরণ, অসহায়দের মুখে খাবার পৌছানোর মতো চরমতম এই যুদ্ধের পাশাপাশি ইয়াবা পাচারকারীদের কলিজাটাও কত বড় তা দেখে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ।