শুভ চট্টগ্রাম ডেস্ক : চীনের উহান শহরে ভাইরাসটির উৎপত্তি এবং বর্তমানে চীন ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। এমনভাবে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে যে, গোটা বিশ্ববাসী এখন আতঙ্কিত। এর কারণে এখন পৃথিবীর অনেকগুলো দেশ লকডাউন ঘোষণা করেছে। দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অফিস আদালত, ফার্মেসি এবং গ্রোসারির শপগুলো ছাড়া প্রায় সবপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো বাতিল করা হয়েছে। এর কারণে পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থাও অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়ার মতো অবস্থা হয়েছে। স্টক মার্কেটগুলোতে ধস নেমেছে, সুপার শপগুলোতে লোকজন লাইন দিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো কিনতে শুরু করেছে। এমনকি এই মহামারীর কারণে পণ্যসামগ্রীর সঙ্কটও সামনে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। এই মহামারীর কারণে এ পর্যন্ত অনেক লোকের প্রাণহানি ঘটছে, অনেক লোকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

আমরা করোনাভাইরাস নিয়ে খুবই অসহায় হয়ে পড়েছি। সবার মাঝেই হাহাকার, পৃথিবীর সবগুলো পরাশক্তি মিলেও এই করোনাভাইরাস সামাল দিতে পারছে না। শক্তিধর দেশগুলো যেন এই করোনাভাইরাসের কাছে নাকানি-চুবানি খাচ্ছে। মানুষ যে কতটা অসহায়, এই পরিস্থিতি আমাদের সেটাই বলে দিচ্ছে।

মাইক্রোস্কোপ ছাড়া দেখাই সম্ভব নয়, যেটাকে আমরা ধরতে পারছি না, ছুঁতে পারছি না, দেখতে পারছি না সেই ছোট্ট ভাইরাসটির সামনে কতটা অসহায় আমরা, কতটা দুর্বল আমরা সেটা এখন টের পাওয়া যাচ্ছে। সুরা আন-নিসার ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, ‘আমি মানুষকে দুর্বল করে তৈরি করেছি।’ মানুষ যে কতটা দুর্বল, কতটা অসহায় তার প্রমাণ হচ্ছে এই করোনাভাইরাস। করোনাভাইরাসের আক্রমণেই আমরা দিশাহারা। কাল যদি জানা যায়, আমেরিকায় এক নতুন শক্তিশালী ভাইরাস আক্রমণ শুরু করেছে যেটা করোনাভাইরাসের চেয়েও ভয়ঙ্কর। তারপর দিন যদি আমরা শুনি যে, জাপানে আরেকটি নতুন ভাইরাস এসেছে, যেটা আরো ভয়ঙ্করÑ তা হলে মানুষের অবস্থাটা কী হতে পারে? আসলে আমরা যে বড় অসহায়, বড় দুর্বল, তার জ্বলন্ত একটা প্রমাণ এগুলো।

এই করোনাভাইরাসের আক্রমণ কোনো কিছু দিয়েই ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। আসলে কোনো কিছুই আমাদের বাঁচাতে পারে না আল্লাহর করুণা যদি না পাই। তাই আসুন, আমরা আমাদের মহান রবের দিকে ফিরে আসি। আমরা তওবা করি, ইশতেগফার পড়ি। আমরা আমাদের সব পাপের জন্য, ব্যক্তিগত পাপ এবং সম্মিলিত পাপের জন্য সবাই মিলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। করোনা ভাইরাসকে এখন আমরা যতটা ভয় পাচ্ছি, তার অর্ধেক ভয়ও যদি আমরা আল্লাহকে পেতাম, তা হলে, এই বিপর্যয় আমাদেরকে পেয়ে বসত না।

এই দুর্যোগ বা মহামারী আমাদের মধ্যে কেন আসে? আমরা যদি কুরআন সুন্নাহের দিকে একটু নজর দেই তা হলে দেখব, সুরাতুল রূমের ৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক এরশাদ করছেন, ‘জলে স্থলে যত দুর্যোগ, বিপর্যয় এবং মহামারী ধেয়ে আসেÑ সেগুলো আসলে আমাদের হাতের কামাই, সেগুলো আমাদের উপার্জিত পাপের ফসল। আমরা যদি নাফরমানি ছেড়ে দিয়ে এক আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হতাম, আল্লাহর দেয়া বিধি-বিধান ও শরিয়াহর নিয়ম-কানুন, ইসলামের বিধান মেনে চলতাম তা হলে এই গজব, এই আজাব, এই বিপর্যয়, এই মহামারী আমাদের আক্রমণ করত না।’ সুরাতুল রূমের এই আয়াতের আলোকে আমরা বুঝতে পারি, এগুলো আমাদেরই পাপের ফসল মাত্র। আমাদের পাপের কারণেই আল্লাহ তায়ালা এ ধরনের দুর্যোগ ও মহামারী দিয়ে আমাদের পরীক্ষায় ফেলে দেন।

দ্বিতীয় যে কারণটি রয়েছে সেটি সুনান ইবনে মাজাহর বর্ণিত একটি হাদিস দ্বারা ব্যাখা করা যায়। হাদিসটিতে রাসূল সা: বলেছেন, সমাজে যখন অশ্লীলতা ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ তায়ালা সেই সমাজে ত’অউম, অর্থাৎ মহামারী পাঠান, প্লেগ পাঠান। কোনো সমাজে যখন অশ্লীলতা, নগ্নতা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে এবং এসব যখন সহজলভ্য হয়ে যায়, মানুষ যখন এগুলো প্রচার করতে একটুও দ্বিধাবোধ করে নাÑ তখন আল্লাহ তায়ালা সেই সমাজে মহামারী ও আজাব পাঠান।

দুই নম্বর কারণটি বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি, এই অশ্লীলতা, এই নুডিজম এখন গোটা বিশ্বের পত্রপত্রিকায়, ম্যাগাজিনে, ইলেকট্রোনিক ও প্রিন্টিং মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। ইন্টারনেটের ও ইউটিউবের মাধ্যমে যে কেউ এগুলোর অ্যাক্সেস পেয়ে যাচ্ছে। ফলে গোটা বিশ্ব এখন অশ্লীলতায় সয়লাব। সুনান ইবনে মাজাহর এ হাদিসের আলোকে আমরা বুঝতে পারছি, অশ্লীলতা যখন কোনো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে তখন আল্লাহ তায়ালা ওই সমাজে ‘রিমাইন্ডার’ হিসেবে মহামারী পাঠান।

এসব দুর্যোগ বা মহামারীর তিন নম্বর কারণটি হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা মাঝে মধ্যে আমাদের পরীক্ষা করার জন্য মহামারী পাঠান। কে ধৈর্যধারণ করল, কে ঈমানহারা হলো, কে ঈমানের পথে অবিচল থাকতে পারলোÑ এগুলো দেখার জন্যই মাঝে মধ্যে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে মহামারী পাঠিয়ে থাকেন। গোটা দুনিয়াটাই হচ্ছে মূলত পরীক্ষা। অবশ্যই আমি তোমাদেরকে ভয় দিয়ে, ক্ষুধা দিয়ে, প্রাণ নাশের ও সম্পদ নাশের আশঙ্কা দিয়ে তোমাদের পরীক্ষা করে থাকি।’ আল্লাহ দেখতে চান, এই জীবন ও মৃত্যুর ধারাবাহিকতার মধ্যে থেকে কে ভালো কাজ করে, আর কে খারাপ কাজ করে। সূরা মুলকে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘লিয়াল্লাকুম আইয়াকুম আহনাকুম’-আল্লাহ দেখতে চান যে, কে তোমাদের মধ্য থেকে ভালো কাজ করে, কে সৎ কাজ করে, আর কে খারাপ কাজ করে। এর পরীক্ষা হিসেবেও আল্লাহ তায়ালা এই দুর্যোগ ও মহামারী পাঠাতে পারেন।

সহিহ মুসলিমের হাদিসের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, আল্লাহ তায়ালা মাঝে মধ্যে আজাব হিসেবেও পৃথিবীতে মহামারী পাঠান। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসের আলোকে আমরা জানব, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের আজাব। আমাদের পূর্ববর্তী অনেক জাতির ওপরও আল্লাহ এভাবে আজাব পাঠিয়েছেন। তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য যাতে আমরা নাফরমানি ছেড়ে দেই। আমরা যাতে আল্লাহর দিকে ফিরে আসি। সহিহ মুসলিমের আরেকটি বর্ণনায় পাওয় যায়, রাসূল সা: বলেছেন, এই মহামারী, এই প্লেগ এটা এক ধরনের আজাব, যেটা আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী অনেক জাতির ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে বনি-ইসরাইলের কথা এখানে বলা হয়েছে। এই হাদিসের আলোকে আমরা বুঝতে পারছি যে, মাঝে মধ্যে আজাব হিসেবেও আল্লাহ তায়ালা এই মহামারী পাঠান।

এরপর এই ধরনের দুর্যোগ বা মহামারীর আরো একটি বিশেষ কারণ হচ্ছে, এটি কেয়ামতের আলামতও হতে পারে। আমরা কিছু হাদিসেও এ রকম পেয়েছি। আল্লাহর রাসূল সা: এরশাদ করেছেন, কেয়ামতের আগে পৃথিবীব্যাপী এক ভয়ঙ্কর মহামারীর আবির্ভাব ঘটবে। এ ধরনের আলামত হচ্ছে মাইনর সাইনস অব দ্যা ডে অব জাজমেন্ট। কেয়ামতের ছোট ছোট আলামতগুলোর অন্যতম হচ্ছে, কেয়ামতের আগে ভয়ঙ্কর ধরনের মহামারী গোটা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। সহিহ বুখারির এক বর্ণনায় রাসূল সা: এরশাদ করেছেন, ‘কেয়ামতের আগে ছয়টি জিনিস ঘটবেই। তোমরা হাতে গুণে রাখো যে, এই ছয়টা জিনিস যদি পৃথিবীব্যাপী না ঘটে তা হলে পৃথিবীতে কেয়ামত সঙ্ঘটিত হবে না। এই ছয়টি বিষয়ের একটি বিষয় হচ্ছে, মহামারী।’ রাসূল সা: বলেছেন, ‘বকরির পালে বা ছাগলের পালে যেভাবে মহামারী ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি মানব জাতির মাঝেও ভয়ঙ্কর মহামারী ছড়িয়ে পড়বে।’ তা হলে আমরা কুরআন এবং সুন্নাহর আলোকে যা জানতে পারলাম তা হলো, এটা কেয়ামতের আলামতগুলোর অন্যতম আলামত। রাসূল সা: বলেছেন, ছয়টি কাজ না হলে কেয়ামত হবে না।

এর একটি হচ্ছে মহামারী। ব্যাপক হারে মহামারী ছড়িয়ে যাবে পৃথিবীতে। অন্য যে আলামতটি হলো, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আজাব। আমরা যাতে নাফরমানী ছেড়ে দিয়ে এক আল্লাহর ইবাদত করি, আল্লাহর দিকে ফিরে আসি, সেজন্য আল্লাহ তায়ালা রিমাইন্ডার হিসেবে এই মহামারী পাঠিয়েছেন। এরপর আমরা জানতে পারলাম, এগুলো আমাদের হাতের কামাই, আমাদের পাপের ফসল। এগুলোর জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী। এরপর চার নম্বরটি হলো অশ্লীলতার ছড়াছড়ি যখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, যখন মানুষের মধ্যে হায়া, শরম, লজ্জা বা লজ্জার যে ভূষণ ও সৌন্দর্য সেটা আর অবশিষ্ট থাকে না, তখন আল্লাহ তায়ালা এই ধরনের বালা বা মুসিবত দেন। এটি একটি পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এবং আল্লাহর কাছে পানাহ চাইতে হবে।