নিজস্ব প্রতিবেদক :
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না চট্টগ্রামে। বিশেষ করে নগরীর সবকটি বাজার ও ওষুধের দোকানে ভিড় জমিয়ে চলছে কেনাকাটা। মোড়ে মোড়ে চলছে রিক্সায় যাত্রী পরিবহণ। অলি-গলি ও মসজিদগুলোর আশেপাশে চলছে আড্ডা। খাবার বিতরণের নামে পুলিশ ও রাজনীতিক নেতারা করছেন দু:স্থ সমাবেশ।

অথচ করোনা সংক্রমণ রোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু‘র নির্দেশনা মোতাবেক চিকিৎসা প্রশাসনের লোকজন সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে নগরবাসীকে ঘরে থাকার তাগিদ দিচ্ছে বার বার। সরকারও সামাজিক দুরত্ব মেনে চলার উপর জোর দিচ্ছে। ফলে নিয়মটি কার্যকর করতে মাঠে নেমেছে পুলিশ ও সেনাবাহিনী।

কিন্তু বাস্তব অবস্থা হচ্ছে পুলিশ ও সেনাবাহিনী দেখলে পালায়-পালায় অবস্থা। পুলিশ-সেনাবাহিনী গেলে ক্রেতা-বিক্রেতা আবার শুরু করে জটলা পাকিয়ে কেনাকাটা। যেখান থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা শতভাগ বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।

চট্টগ্রাম মহানগরীর বেসরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, করোনাভাইরাসের প্রকোপ ঠেকাতে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা যে নির্দেশনাগুলো দিয়েছে চট্টগ্রামে তা কার্যত অচল। বিশেষ করে রিক্সাচালক, নির্মাণ শ্রমিক, বালু শ্রমিক, ইটভাটা শ্রমিকসহ দিনমজুর শ্রেণির মানুষগুলো একটি নিয়ম মেনে চলার ধারে-কাছেও নেই।

এদের হাত ধোয়া তো দুরের কথা, মুখে মাস্কও পড়ে না। হাতে মাস্ক নিয়ে ঘুরে, পুলিশ-সেনাবাহিনী দেখলে মুখে লাগায়। করোনা আক্রান্ত কেউ এদের রিক্সায় চড়লে বা সংস্পর্শে আসলে সেখান থেকেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। ফলে সবচেয়ে ঝুঁকি তৈরী করছে তারা।

নগরীর সবকটি হাটবাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানেও এসব নিয়ম মানা হচ্ছে না। ক্রেতা-বিক্রেতাদের মুখে মাস্ক থাকলেও হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের বালাই নেই। মানা হচ্ছে না সামাজিক দুরত্বও। প্রতিটি দোকানে ভিড় করেই কেনাকাটা চলছে। বিশেষ করে ওষুধের দোকানে ভিড় লেগেই থাকে সকাল-সন্ধ্যায়।

নগরীর বহদ্দারহাট হক মার্কেট সংলগ্ন ১০-১২টি ওষুধের দোকানে দেখা যায়, বিক্রয়কর্মীরা মুখে মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস লাগালেও জটলা পাকিয়ে ওষুধ বিক্রী চলছে আগের মতোই। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের ওষুধের দোকানগুলোরও একই অবস্থা। ফলের দোকানগুলোর অবস্থা আরো কাহিল।

এছাড়া পুলিশ ও সেনাবাহিনীর তোপের মুখে মানুষ নগরীর রাজপথ ছাড়লেও আবাসিকসহ বিভিন্ন সড়কের অলি-গলিতে সকাল-বিকেল আড্ডা চলছে। নামাজ শেষে মসজিগুলোর আশেপাশে জটলা বসে। এদের করোনাভাইরাস সংক্রমণের কোনো ভয় নেই।

সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) চট্টগ্রাম মহানগরীতে সাধারণ মানুষের মাঝে তুলনামূলক কম দামে পণ্য বিক্রি শুরু করছে। নগরীতে ২২টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে করে ৩৪টি গুরুত্বপূর্ণ স্পটে তেল, চিনি ও ডাল বিক্রি করছে টিসিবি।

কিন্তু টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনতেও ক্রেতারা সামাজিক দূরত্ব মানছেন না। টিসিবির ভ্রাম্যমাণ ট্রাক যেখানেই দেখছেন ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। তবে টিসিবি চট্টগ্রামের অফিস প্রধান জামাল আহমদ জানান, ট্রাকে করে পণ্য বিক্রির সময় ৩ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে পণ্য কেনার জন্য ক্রেতাদের সচেতন করছি। পুলিশ ও সেনাবাহিনী সহযোগিতা করছেন। তবে অনেক সময় ক্রেতারা দূরত্ব বজায় রেখে পণ্য কেনার বিষয়টি মানতে চান না। সবাই একসাথে কিনতে হুড়োহুড়ি করে। এতে সবার মাঝে করোনা আতঙ্ক বাড়ছে।

কয়েকজন চিকিৎসকের ভাষ্য, করোনাভাইরাস সক্রমণ রোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু‘র নির্দেশনা শতভাগ কার্যকর এবং বিশ্বের করোনা আক্রান্ত দেশগুলো তা মেনে চললেও আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাবে চট্টগ্রামে তা মানা হচ্ছে না। স্বাস্থ্য সচেতন ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষ এসব নিয়ম মেনে চললেও নিম্মবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য তারাও নিরাপদ নন।

সূত্রমতে, নিয়ম রক্ষায় পুলিশ প্রশাসনের ভুমিকা হাস্যকর। তারা একদিকে বলছে ঘরে থাকুন, অন্যদিকে ঘর থেকে ডেকে এনে খাবার বিতরণ করছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নামে গুটি কয়েক দোকানে বৃত্ত তৈরী করে তা ফলাওভাবে গণমাধ্যমে প্রচার করেছে। কিন্তু কার্যত কোথাও এ নিয়ম মানা হচ্ছে না।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মাহবুবর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, করোনায় নিম্ম আয়ের মানুষ খাদ্যের কষ্ঠে পড়েছে। তাদের খাবার বিতরণেও সামাজিক দুরত্ব মেনে চলার নির্দেশনা রয়েছে। হাট-বাজারে সামাজিক দুরত্ব মেনে কেনাকাটার জন্যও নির্দেশনা দেয়া আছে। নির্দেশনা না মানলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি মিয়া বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু‘র নির্দেশনা মেনে চলার দিকে আমাদের নজর বেশি। এ মুহুর্তে এ নির্দেশনা মেনে চলা ছাড়া কোনো উপায়ও নেই। নির্দেশনা মানায় চট্টগ্রামে এখনো পর্যন্ত কোনো করোনা আক্রান্ত শনাক্ত হয়নি। তবে এ নিয়ম রক্ষা নিম্মবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য কঠিন। এছাড়া কিছু অসাধু ব্যবসায়ীও রয়েছে। যারা নগরবাসীর জন্য হুমকি। এদের বিষয়ে আমরা কঠোর পদক্ষেপ নেব।